লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-05-21
যখন কোনো শিশু পিতামাতার যত্ন থেকে বঞ্চিত হয় বা পিতামাতা শিশুর সম্পত্তি পরিচালনায় অক্ষম হন, তখন আইনি অভিভাবকত্বের মাধ্যমে আইন এগিয়ে আসে। বাংলাদেশে অভিভাবক ও পোষ্য আইন ১৮৯০ — মুসলিম ও হিন্দুদের ব্যক্তিগত আইনের সাথে মিলে — কে অভিভাবক হতে পারবেন, আদালত কীভাবে অভিভাবক নিয়োগ করেন এবং সেই নিয়োগ থেকে কী অধিকার ও দায়িত্ব উদ্ভব হয় তা নিয়ন্ত্রণ করে। আপনি যদি সন্তানের অভিভাবকত্ব চান অথবা শিশুর সম্পত্তি রক্ষা করতে চান, তাহলে আইনি কাঠামো বোঝাই প্রথম পদক্ষেপ।
বাংলাদেশে অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত প্রধান আইন হলো অভিভাবক ও পোষ্য আইন, ১৮৯০ (আইন নং VIII/১৮৯০), যা এখনও সীমিত সংশোধনসহ কার্যকর আছে। এটি অপ্রাপ্তবয়স্কদের — যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে (আদালতের তত্ত্বাবধানে সম্পত্তির ক্ষেত্রে কিছু ক্ষেত্রে ২১ বছর পর্যন্ত) — অভিভাবক নিয়োগ ও তত্ত্বাবধানের জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো প্রদান করে।
এই আইনটি মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন এবং হিন্দু প্রথাগত আইনের সাথে সহাবস্থান করে। আইনটি পারিবারিক আদালতকে (মহানগরী এলাকায়) এবং জেলা জজের আদালতকে অভিভাবক নিয়োগ ও তত্ত্বাবধানের এখতিয়ার দেয়।
সমস্ত অভিভাবকত্ব কার্যক্রমে মূল নীতি হলো অপ্রাপ্তবয়স্কের কল্যাণ — আদালতকে ধর্মীয় বা পারিবারিক দাবির চেয়ে শিশুর শারীরিক, নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক মঙ্গলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অভিভাবকত্ব দুটি ভিন্ন ক্ষেত্র কভার করে: ব্যক্তির অভিভাবকত্ব (শিশুর শারীরিক যত্ন, লালনপালন ও শিক্ষা) এবং সম্পত্তির অভিভাবকত্ব (শিশুর সম্পদ পরিচালনা)। বিবাহবিচ্ছেদ বা বিচ্ছেদের মুখোমুখি পিতামাতার উচিত একজন অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া।
অভিভাবক ও পোষ্য আইন ১৮৯০ বিভিন্ন ধরনের অভিভাবক স্বীকার করে:
প্রাকৃতিক অভিভাবক আদালতের আদেশের পরিবর্তে ব্যক্তিগত (ধর্মীয়) আইন থেকে কর্তৃত্ব পান। মুসলিম আইনে পিতা এবং হিন্দু আইনে পিতাই প্রাকৃতিক অভিভাবক।
মৃত পিতামাতার উইলের মাধ্যমে নিযুক্ত অভিভাবক। ধারা ৯ অনুযায়ী, পিতা বা মাতা উইলে অভিভাবক নিয়োগ করতে পারেন, যিনি পিতামাতার মৃত্যুর পরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
কোনো প্রাকৃতিক বা উইলকৃত অভিভাবক না থাকলে, বা বিদ্যমান অভিভাবক অনুপযুক্ত বিবেচিত হলে আদালত ধারা ৭ অনুযায়ী অভিভাবক নিয়োগ করতে পারে। শিশুর যেকোনো স্বার্থবান ব্যক্তি — নিকটাত্মীয়, পারিবারিক বন্ধু, এমনকি ১৪ বছরের বেশি বয়সী শিশু নিজেও — আবেদন করতে পারেন।
আইনি কর্তৃত্ব ছাড়াই শিশুর দায়িত্ব নেওয়া ব্যক্তি — সাধারণত এতিম শিশুর যত্নশীল কোনো আত্মীয়। আইনের ধারা ১১ অনুযায়ী বাস্তব অভিভাবকরা শিশুর সম্পত্তি নিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেনদেন করতে পারেন না — এর জন্য আগে আদালতের অনুমতি নিতে হবে।
বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (প্রধানত হানাফি মাজহাব) অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইসলামী আইন বিলায়েত (সম্পত্তি ও আইনি বিষয়ের অভিভাবকত্ব) এবং হিজানাত (শিশুর শারীরিক যত্ন ও হেফাজত)-এর মধ্যে পার্থক্য করে।
হানাফি আইনের অধীনে মায়ের সম্পত্তির আইনি অভিভাবকত্ব নেই, তবে বাংলাদেশের আদালতগুলো শিশুর কল্যাণের প্রয়োজনে মাকে অভিভাবক নিযুক্ত করার ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান নমনীয় হচ্ছে।
মায়ের হিজানাতের অধিকার রয়েছে: পুত্রের ক্ষেত্রে ৭ বছর পর্যন্ত এবং কন্যার ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত। মা অপরিচিত কাউকে বিয়ে করলে বা নৈতিকভাবে অযোগ্য প্রমাণিত হলে এই অধিকার হারাতে পারেন।
বাংলাদেশের আদালত খুরশিদা বেগম বনাম সালাউদ্দিন-সহ বহু মামলায় রায় দিয়েছে যে শিশুর কল্যাণ ধর্মীয় অগ্রাধিকারের চেয়ে বড়। মুসলিম অভিভাবকত্ব বিরোধে একজন পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য অভিভাবকত্ব অভিভাবক ও পোষ্য আইন ১৮৯০ এবং প্রথাগত হিন্দু আইনের সমন্বয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। বাংলাদেশে কোনো সংহিতাবদ্ধ হিন্দু পারিবারিক আইন নেই, তাই আদালত স্মৃতিশাস্ত্র, বিচারিক নজির এবং কল্যাণ নীতির উপর নির্ভর করে।
হিন্দু অপ্রাপ্তবয়স্কের পৈতৃক যৌথ পরিবারের সম্পত্তি — হিন্দু অবিভক্ত পরিবার (এইচইউএফ) — পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুরুষ সদস্য (কর্তা) পরিচালনা করেন। কর্তার ব্যাপক ক্ষমতা থাকলেও আইনি প্রয়োজনীয়তা বা আদালতের অনুমতি ছাড়া পৈতৃক সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন না। বাংলাদেশে দায়ভাগ স্কুল প্রযোজ্য, যা পুত্র ও কন্যাদের আরও সমান উত্তরাধিকার অধিকার দেয়। হিন্দু পরিবারের সম্পত্তি ও অভিভাবকত্ব বিরোধে একজন অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
অভিভাবক ও পোষ্য আইন ১৮৯০ অনুযায়ী আদালত-নিযুক্ত অভিভাবকত্বের জন্য পারিবারিক আদালত বা জেলা জজের আদালতে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
আবেদনকারী পারিবারিক আদালতে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটে) বা জেলা জজের আদালতে (অন্য জেলায়) অভিভাবকত্ব আবেদন দাখিল করেন। আবেদনে উল্লেখ করতে হবে: শিশুর নাম, বয়স ও ধর্ম; আবেদনকারীর শিশুর সাথে সম্পর্ক; অভিভাবকত্বের কারণ; শিশুর সম্পত্তির বিবরণ এবং বিদ্যমান অভিভাবকের তথ্য।
আদালত সমস্ত স্বার্থান্বিত পক্ষকে নোটিশ পাঠায়। তারপর একটি কল্যাণ তদন্ত পরিচালনা করে — শিশুর সাক্ষাৎকার, আবেদনকারীর পটভূমি পরীক্ষা এবং আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা অন্তর্ভুক্ত। আদালত শিশুর স্বার্থ স্বাধীনভাবে প্রতিনিধিত্বের জন্য গার্ডিয়ান অ্যাড লিটেম নিয়োগ করতে পারে।
সকল পক্ষের শুনানির পর আদালত আবেদনকারীকে অভিভাবক নিযুক্ত করে অথবা অন্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয় বা আবেদন খারিজ করে। বিনা বিতর্কে সমগ্র প্রক্রিয়া সাধারণত ৩-৬ মাস সময় নেয়। একজন দক্ষ পারিবারিক আইনজীবী আবেদনটি সঠিকভাবে প্রস্তুত করতে এবং কল্যাণ তদন্তে পেশাদারভাবে সহায়তা করতে পারেন।
অভিভাবক — প্রাকৃতিক হোক বা আদালত-নিযুক্ত — বাংলাদেশে শিশুর প্রতি গুরুত্বপূর্ণ আইনি অধিকার এবং সংগত দায়িত্ব বহন করেন।
বিশ্বাসভঙ্গকারী অভিভাবক দেওয়ানি দায়, আদালত কর্তৃক অপসারণ এবং ইচ্ছাকৃত আত্মসাতের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি অনুযায়ী ফৌজদারি মামলার মুখে পড়তে পারেন। কোনো অভিভাবক শিশুর স্বার্থ নষ্ট করছেন বলে মনে হলে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
অভিভাবকত্ব স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় নয়। অভিভাবক ও পোষ্য আইন ১৮৯০ অভিভাবকত্ব শেষ হওয়ার বেশ কয়েকটি পথ প্রদান করে।
আদালত যেকোনো সময় অভিভাবককে অপসারণ করতে পারে। ধারা ৩৯ অনুযায়ী অপসারণের কারণগুলো হলো:
শিশুর কল্যাণে স্বার্থান্বিত যেকোনো ব্যক্তি — আত্মীয়, সমাজকর্মী বা সরকারি কর্তৃপক্ষ — অভিভাবক অপসারণের জন্য আবেদন করতে পারেন। ১৪ বছরের বেশি বয়সী শিশু নিজেও আদালতে তার অভিভাবক পরিবর্তনের আবেদন করতে পারে। আপনি যদি অপসারণ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন বা একজন অযোগ্য অভিভাবকের বিরুদ্ধে লড়তে চান, তাহলে পারিবারিক আইনজীবী বা অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলমের সাথে যোগাযোগ করুন।