ওয়ারিশ সম্পত্তি বিক্রির পর অন্য শরিকের ‘অগ্রক্রয়াধিকার’ (Pre-emption): নিজের হক ফিরে পাওয়ার আইনি পথ

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-15

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

পৈতৃক বা যৌথ সম্পত্তিতে একজন শরিক বাকি শরিকদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে গোপনে কোনো বহিরাগত অচেনা ব্যক্তির কাছে নিজের অংশ বিক্রি করে দেয়। এর ফলে পরিবারের শান্তির ব্যাঘাত ঘটে এবং বহিরাগত লোক এসে বসতভিটায় ঝামেলা পাকায়। অন্য শরিকদের বাদ দিয়ে জমি বিক্রি করলে আইন অনুযায়ী সেই জমি আদালত মারফত নিজের দখলে নেওয়ার নিশ্চিত প্রতিকার হলো 'অগ্রক্রয়াধিকার' (Pre-emption)। বিস্তারিত আলোচনা করেছেন দেওয়ানি আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।

অগ্রক্রয়াধিকার (Right of Pre-emption) আসলে কী?

সহজ ভাষায় অগ্রক্রয়াধিকার হলো—কোনো যৌথ বা শরিকি জমির কোনো অংশ বিক্রি করার ক্ষেত্রে বাইরের কোনো ব্যক্তির তুলনায় সহ-শরিক বা সংলগ্ন প্রতিবেশীর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওই জমি ক্রয়ের আইনি অধিকার। আইন বলে, কোনো অংশীদার তার ভাগ বিক্রি করতে চাইলে প্রথমে তার সহ-শরিকদের প্রস্তাব দিতে হবে। যদি শরিককে না জানিয়ে তৃতীয় পক্ষের নিকট বিক্রি করা হয়, তবে আইনসঙ্গত প্রক্রিয়ায় শরিক আদালতের মাধ্যমে ওই জমি নিজে কিনে নেওয়ার ডিক্রি পেতে পারেন।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ৯৬ ধারার বিধান

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন ও রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ (State Acquisition and Tenancy Act, 1950)-এর ৯৬ ধারা অনুযায়ী অগ্রক্রয়াধিকারের বিচারিক মোকদ্দমা পরিচালিত হয়। এই ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, বিক্রির নোটিশ পাওয়ার পর বা বিক্রি জানার পর সহ-শরিক আইনগতভাবে আদালতের মাধ্যমে দলিলের টাকা জমা দিয়ে ওই জমি নিজের নামে নিয়ে নেওয়ার অধিকার রাখেন।

কে কে অগ্রক্রয়াধিকারের মামলা করতে পারবেন: অগ্রাধিকারের মাপকাঠি

আইন অনুযায়ী ক্রমানুসারে অগ্রাধিকার নির্ধারিত হয়:

  • ১ম অগ্রাধিকার: উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক (Co-sharer by inheritance)।
  • ২য় অগ্রাধিকার: খরিদসূত্রে সহ-শরিক (Co-sharer by purchase)।
  • ৩য় অগ্রাধিকার: সংলগ্ন জমির মালিক বা প্রতিবেশী (Contiguous land owner - মুসলিম আইন অনুযায়ী)।

যে মারাত্মক ভুলে মামলা খারিজ হয়ে যায়: কঠোর তামাদি সময়সীমা (Time Limit)

অগ্রক্রয়াধিকার মামলায় সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বড় ভুল করেন সময়সীমা নিয়ে। আইন অনুযায়ী—রেজিস্ট্রি দলিলের নোটিশ জারির ২ মাসের মধ্যে অথবা নোটিশ না পেলে জমি বিক্রির সংবাদ প্রথম জানার তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ২ মাসের মধ্যে সহকারী জজ আদালতে মামলা করতে হবে। বিক্রির তারিখ থেকে ৩ বছর পার হয়ে গেলে মামলা তামাদি দোষে সরাসরি বাতিল হয়ে যায়।

আদালতে দলিলের মূল্যের সাথে অতিরিক্ত কত শতাংশ অর্থ জমা দিতে হয়?

মামলা দায়েরের সময় আর্জির সাথে সরকারি চালানের মাধ্যমে আদালতে টাকা জমা দিতে হয়:

  1. রেজিস্ট্রিকৃত দলিলে উল্লিখিত মোট বিক্রয়মূল্যের ১০০% টাকা।
  2. ক্ষতিপূরণ বাবদ দলিলের মূল্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫% ক্ষতিপূরণ অর্থ (Compensation)।
  3. বার্ষিক ৮% হারে সরল সুদ (দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে মামলা দায়েরের দিন পর্যন্ত)।

সহকারী জজ আদালতে অগ্রক্রয়াধিকার মামলা মোকদ্দমা পরিচালনার ধাপ

টাকা জমা দিয়ে মামলা ফাইল করার পর বিজ্ঞ আদালত ক্রেতা ও বিক্রেতাকে সমন পাঠান। ক্রেতা আদালতে হাজির হয়ে আপত্তি জানালে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করেন। বাদী যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে শরিক এবং তাকে প্রস্তাব না দিয়ে গোপনে বিক্রি করা হয়েছে, তবে আদালত বাদীর অনুকূলে ডিক্রি ঘোষণা করেন।

জমি নিজের নামে রেজিস্ট্রি পাওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া

আদালতের রায়ের পর ক্রেতা তার জমা থাকা টাকা ক্ষতিপূরণসহ আদালত থেকে তুলে নেয় এবং বিজ্ঞ আদালত আদালতের ক্ষমতাবলে সংশ্লিষ্ট জমিটি বাদীর অনুকূলে রেজিস্ট্রি ও নামজারি করে দেন।