বাংলাদেশে অংশীদারি ব্যবসা (Partnership) গঠন, ডিড তৈরি ও আরজেএসসি রেজিস্ট্রেশন গাইড ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-11-02 · ১৩ মিনিট পড়ার সময়

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির চেয়ে দ্রুততম ও কম খরচের জনপ্রিয় মাধ্যম হলো **অংশীদারি ব্যবসা বা পার্টনারশিপ ফার্ম (Partnership Business)**। একাধিক উদ্যোক্তা, বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্যরা মিলে মূলধন বিনিয়োগ করে লাভ-লোকসান ভাগ করে নেওয়ার জন্য অংশীদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যবসা জগতে সবচেয়ে মারাত্মক এবং প্রচলিত ভুলটি হলো—**রেজিস্ট্রেশন ছাড়া নিছক নোটারি করা স্ট্যাম্পে বা মৌখিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে অংশীদারি ব্যবসা পরিচালনা করা**। **অংশীদারি আইন ১৯৩২ (The Partnership Act 1932)** অনুযায়ী যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর বা **আরজেএসসি (RJSC)**-তে ফার্মটি আনুষ্ঠানিকভাবে রেজিস্ট্রি না করলে আইনের **৬৯ ধারা** অনুযায়ী এক চরম বিপর্যয় নেমে আসে: কোনো ক্লায়েন্ট বা কাস্টমার বকেয়া বিল বা কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেও আনরেজিস্টার্ড পার্টনারশিপ ফার্ম আদালতে কোনো দেওয়ানি মামলা করতে পারে না এবং পার্টনাররা নিজেদের মধ্যেও অধিকার আদায়ে মামলা করতে পারে না। এই পূর্ণাঙ্গ কর্পোরেট গাইডে পার্টনারশিপ ডিড বা চুক্তিপত্র তৈরির নিয়ম, স্ট্যাম্প ডিউটি, আরজেএসসি ফর্ম-১ দাখিল, ট্রেড লাইসেন্স ও ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।

: · সুপ্রিম কোর্ট ও জজ কোর্ট জামিন আইনজীবী

এক নজরে মূল তথ্য (Quick Answer Table)

বিষয় / শর্তসরকারি নিয়ম, ফি ও আইন (২০২৬)
প্রযোজ্য আইন ও আদালতবাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (CrPC) ও সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ
আগাম ও নিয়মিত জামিনহাইকোর্ট বিভাগে আগাম জামিন (ধারা ৪৯৮ CrPC) ও ম্যাজিস্ট্রেট/দায়রা আদালতে নিয়মিত জামিন
সরকারি পোর্টাল ও যাচাইsupremecourt.gov.bd, judiciary.gov.bd, pcc.police.gov.bd ও land.gov.bd
জরুরি আইনি পরামর্শ চেম্বারঅ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট) — ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬
⚡ এক নজরে
📋 সূচিপত্র
  1. ১. আইনের দৃষ্টিতে অংশীদারি ব্যবসা ও এর মূল শর্তসমূহ
  2. ২. আনরেজিস্টার্ড ফার্মের মারাত্মক পরিণতি: ৬৯ ধারার আইনি নিষেধাজ্ঞা
  3. ৩. অংশীদারি ফার্ম বনাম প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি: সুবিধা ও অসুবিধা
  4. ৪. একটি নিখুঁত পার্টনারশিপ ডিডের অপরিহার্য শর্ত ও স্ট্যাম্প ডিউটি
  5. ৫. আরজেএসসি (RJSC) রেজিস্ট্রেশনের ধাপে ধাপে অনলাইন পদ্ধতি
  6. ৬. তুলনামূলক টেবিল: একমালিকানা বনাম অংশীদারি বনাম লিমিটেড কোম্পানি
  7. ৭. রেজিস্ট্রেশন পরবর্তী করণীয়: ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
  8. ৮. অংশীদারদের বিরোধ, অবসর গ্রহণ ও ফার্ম বিলুপ্তির সঠিক নিয়ম
  9. ৯. প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি পার্টনার যুক্ত করার নিয়মাবলি
  10. ১০. বাস্তব আদালতের কেস স্টাডি: ঢাকার এক লজিস্টিকস ফার্মের ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার
  11. ১১. সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQs)

১. আইনের দৃষ্টিতে অংশীদারি ব্যবসা ও এর মূল শর্তসমূহ

অংশীদারি আইন ১৯৩২ এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে: 'সকলে মিলে অথবা সকলের পক্ষে একজনের দ্বারা পরিচালিত ব্যবসায়ের মুনাফা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিবর্গের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ককে অংশীদারি কারবার বলে।'

  • চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক: অংশীদারি ব্যবসা কোনো জন্মসূত্রে বা পারিবারিক মর্যাদায় জন্মায় না; এটি সম্পূর্ণভাবে একটি বৈধ লিখিত চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। পৈতৃক সম্পত্তি থেকে ভাই-বোন মিলে ভাড়া তুললে তা অংশীদারি ব্যবসা নয়।
  • মুনাফা বন্টনের অঙ্গীকার: ব্যবসায় অর্জিত নিট লাভ এবং আনুপাতিক লোকসান ভাগ করে নেওয়ার সুস্পষ্ট বিধান থাকতে হবে।
  • পারস্পরিক প্রতিনিধিত্ব (Mutual Agency): এটি অংশীদারির মূল প্রাণ। প্রতিটি পার্টনার একই সাথে প্রতিষ্ঠানের মালিক (Principal) এবং অন্য পার্টনারদের প্রতিনিধি (Agent)। সাধারণ ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে একজন পার্টনার কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করলে তার দায়ভার অন্য সকল পার্টনারের ওপর আইনত বর্তায়।

২. আনরেজিস্টার্ড ফার্মের মারাত্মক পরিণতি: ৬৯ ধারার আইনি নিষেধাজ্ঞা

ব্যবসা শুরুর সময় আরজেএসসি রেজিস্ট্রেশন করা ঐচ্ছিক মনে হলেও অংশীদারি আইনের ৬৯ ধারা আনরেজিস্টার্ড ফার্মকে আইনগতভাবে পঙ্গু করে দেয়:

  • তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করার অধিকার নেই: আপনার ফার্ম যদি আরজেএসসিতে রেজিস্ট্রি না থাকে, তবে কোনো ক্লায়েন্ট মাল নিয়ে টাকা না দিলে বা ৫০ লাখ টাকার বিল বকেয়া রাখলেও দেওয়ানি আদালতে কোনো মামলা করতে পারবেন না। আদালত মামলাটি সরাসরি খারিজ করে দেবে।
  • পার্টনারদের নিজেদের মধ্যে মামলার বাধা: ফার্মের কোনো পার্টনার টাকা আত্মসাৎ করলে বা হিসাব দিতে না চাইলে অন্য পার্টনাররা পুরো ফার্ম বিলুপ্তির (Dissolution) মামলা ছাড়া শুধু অধিকার বা মুনাফা আদায়ের জন্য মামলা করতে পারে না।
  • পাল্টা দাবি (Set-off) নিষিদ্ধ: অন্য কেউ আপনার বিরুদ্ধে মামলা করলে আপনি আদালতে কোনো কাউন্টার ক্লেইম বা পাল্টা দেনা সমন্বয়ের দাবি করতে পারবেন না।

৩. অংশীদারি ফার্ম বনাম প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি: সুবিধা ও অসুবিধা

ব্যবসার ধরণ নির্বাচনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি:

  • অংশীদারি ফার্মের সুবিধা: গঠনের খরচ খুবই কম; কোম্পানি আইনের মতো জটিল এজিএম (AGM) বা নিরীক্ষিত অডিট জমার কঠিন বাধ্যবাধকতা নেই; পার্টনাররা যেকোনো সময় মূলধন বা প্রফিট ড্র করতে পারেন।
  • মারাত্মক অসুবিধা (অসীম ব্যক্তিগত দায়): লিমিটেড কোম্পানিতে শেয়ারহোল্ডারদের দায় কেবল তাদের শেয়ারের মূল্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু অংশীদারি ফার্মে কোনো ঋণ বা দেনা হলে পার্টনারদের ব্যক্তিগত বাড়ি, জমি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ক্রোক করে পাওনাদারদের টাকা শোধ করতে হয়। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) বা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সাধারণত পার্টনারশিপে আসে না।

৪. একটি নিখুঁত পার্টনারশিপ ডিডের অপরিহার্য শর্ত ও স্ট্যাম্প ডিউটি

অংশীদারি চুক্তিপত্র হলো প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি। স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯ অনুযায়ী এটি ২,০০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদন করতে হয়:

  • ফার্মের নাম ও মূল কার্যালয়: প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত ট্রেডিং নাম এবং প্রধান অফিসের ঠিকানা।
  • মূলধন ও বিনিয়োগ: কোন পার্টনার কত নগদ অর্থ বা মালামাল প্রদান করলেন এবং মূলধনের ওপর কোনো সুদ দেওয়া হবে কি না।
  • লাভ-লোকসানের অনুপাত: শতকরা হার সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে (যেমন ৬০:৪০)। ডিডে কিছু লেখা না থাকলে আইন অনুযায়ী সকল পার্টনার সমান লাভ-লোকসান ভাগ করতে বাধ্য।
  • ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং ক্ষমতা: ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনার জন্য কে কে স্বাক্ষর করবেন (যৌথ না একক) তা নির্ধারণ।
  • সালিশি ধারা (Arbitration Clause): কোনো অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেখা দিলে আদালতে গিয়ে ব্যবসা বন্ধ না করে সালিশি আইন ২০০১ অনুযায়ী নিরপেক্ষ সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির অঙ্গীকার।

৫. আরজেএসসি (RJSC) রেজিস্ট্রেশনের ধাপে ধাপে অনলাইন পদ্ধতি

যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (RJSC) থেকে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার ধাপসমূহ:

  1. নেম ক্লিয়ারেন্স গ্রহণ: আরজেএসসি পোর্টালে (rjsc.gov.bd) আবেদন করে প্রস্তাবিত ফার্মের নামের ছাড়পত্র সংগ্রহ করুন।
  2. চুক্তিপত্র সম্পাদন ও নোটারি: ২,০০০ টাকার স্ট্যাম্পে সকল পার্টনারের স্বাক্ষর এবং দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সত্যায়ন সম্পন্ন করুন।
  3. ফর্ম-১ (Form I) পূরণ: অংশীদারি আইনের ৫৮ ধারা মোতাবেক ফর্ম-১ এ ফার্মের নাম, ব্যবসার প্রকৃতি, পার্টনারদের নাম-ঠিকানা ও যোগদানের তারিখ উল্লেখ করে সকল পার্টনার স্বাক্ষর করবেন।
  4. ট্রেজারি ফি জমা: সরকারি নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফি সোনালী ব্যাংকে জমা দিয়ে ই-পেমেন্ট সম্পন্ন করুন।
  5. রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট লাভ: আরজেএসসি নথি পরীক্ষা করে ফার্মের আনুষ্ঠানিক রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (Certificate of Registration) প্রদান করবে।
⚖️ আইনি কেস মূল্যায়ন ও চেম্বার অ্যাপয়েন্টমেন্ট

আপনার জমি বিরোধ, বাটোয়ারা মামলা, জামিন, তালাক বা সাইবার জটিলতায় বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে সুপ্রিম কোর্ট বা উত্তরা চেম্বারে নথিপত্রসহ সরাসরি বসুন।

জরুরি হোয়াটসঅ্যাপ সরাসরি কল: ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬

৬. তুলনামূলক টেবিল: একমালিকানা বনাম অংশীদারি বনাম লিমিটেড কোম্পানি

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তুলনামূলক আইনি বৈশিষ্ট্য নিচে উল্লেখ করা হলো:

প্রতিষ্ঠানের ধরণনিয়ন্ত্রক আইনব্যক্তিগত দায় (Liability)নিবন্ধন কর্তৃপক্ষমামলা করার আইনি সক্ষমতা
একমালিকানা (Proprietorship)স্থানীয় সরকার / পৌরসভা আইন১০০% অসীম ব্যক্তিগত দায়সিটি কর্পোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদমালিক ব্যক্তিগত নামে মামলা করতে পারেন
নিবন্ধিত অংশীদারি ফার্মঅংশীদারি আইন ১৯৩২যৌথ ও পৃথকভাবে অসীম দায়আরজেএসসি (RJSC)ফার্মের নামে মামলা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে
অনিবন্ধিত অংশীদারি ফার্মঅংশীদারি আইন ১৯৩২অসীম দায় বিদ্যমানকোনো নিবন্ধন নেই৬৯ ধারায় মামলা করার ক্ষমতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকোম্পানি আইন ১৯৯৪সীমিত দায় (ব্যক্তিগত সম্পদ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত)আরজেএসসি (কর্পোরেট পরিদপ্তর)স্বাধীন আইনি সত্ত্বা হিসেবে মামলা চালাতে পারে

৭. রেজিস্ট্রেশন পরবর্তী করণীয়: ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট

আরজেএসসি সার্টিফিকেট পাওয়ার পর ব্যবসা পরিচালনার প্রাথমিক কাজগুলো সম্পন্ন করতে হয়:

  • ফার্মের নামে আলাদা ই-টিন: আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী নিবন্ধিত অংশীদারি ফার্মের নামে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) থেকে ১২ ডিজিটের কর শনাক্তকরণ নম্বর (e-TIN) গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।
  • সিটি কর্পোরেশন ট্রেড লাইসেন্স: ফার্মের আরজেএসসি সার্টিফিকেট ও ভাড়াচুক্তি জমা দিয়ে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন অঞ্চল বা পৌরসভা থেকে বাণিজ্যিক ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করুন।
  • ব্যাংক চলতি হিসাব: ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিন, পার্টনারদের এনআইডি ও আরজেএসসি প্রত্যয়িত ডিড জমা দিয়ে যেকোনো তফসিলি ব্যাংকে পার্টনারশিপ একাউন্ট খোলা হয়।
  • ভ্যাট (BIN) লাইসেন্স: মালামাল আমদানি, সরবরাহ বা উৎপাদন ব্যবসা হলে এনবিআর থেকে ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে।

৮. অংশীদারদের বিরোধ, অবসর গ্রহণ ও ফার্ম বিলুপ্তির সঠিক নিয়ম

অংশীদারদের মধ্যে মনোমালিন্য হলে আইনের পথ অনুসরণ করতে হয়:

  • নতুন পার্টনার গ্রহণ (৩১ ধারা): ডিডে অন্যথা না থাকলে সকল পার্টনারের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছাড়া নতুন কোনো ব্যক্তিকে পার্টনার করা যায় না।
  • পার্টনারের অবসর গ্রহণ (৩২ ধারা): কোনো পার্টনার চুক্তি অনুযায়ী অবসর নিতে পারেন। তবে ৭২ ধারা অনুযায়ী পত্রিকায় ও আরজেএসসিতে পাবলিক নোটিশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি অবসর নেওয়ার পরও ফার্মের নতুন দেনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন।
  • ফার্মের বিলুপ্তি (Dissolution): সকল পার্টনারের সম্মতিতে অথবা দেওয়ানি আদালতে ৪৪ ধারায় মামলা করে ফার্ম বিলুপ্ত করে সকল সম্পদ বিক্রি করে দেনা পরিশোধ শেষে মুনাফা বন্টন করা যায়।

৯. প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি পার্টনার যুক্ত করার নিয়মাবলি

প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে না এসেও অংশীদারি ব্যবসায় মূলধন বিনিয়োগ করতে পারেন। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা ডিড সত্যায়ন করিয়ে দেশে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অংশীদারি ফার্ম গঠন করা আইনত বৈধ। তবে বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন (FERA 1947) মেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিপোর্টিং বজায় রাখা আবশ্যক।

১০. বাস্তব আদালতের কেস স্টাডি: ঢাকার এক লজিস্টিকস ফার্মের ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার

তেজগাঁওয়ের তিন তরুণ উদ্যোক্তা মিলে নোটারি স্ট্যাম্পে একটি আনরেজিস্টার্ড লজিস্টিকস ফার্ম পরিচালনা করছিলেন। একটি বড় কারখানা তাদের ৭০ লক্ষ টাকার পরিবহন বিল বকেয়া রেখে দিতে অস্বীকার করে। উদ্যোক্তারা আদালতে মামলা করতে গেলে জানতে পারেন যে আরজেএসসি রেজিস্ট্রেশন না থাকায় **অংশীদারি আইনের ৬৯ ধারায় তাদের মামলা আদালত সরাসরি খারিজ করে দেবে**।

উদ্যোক্তারা আমাদের কর্পোরেট লিগ্যাল চেম্বারের শরণাপন্ন হলে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিই:

  1. তড়িঘড়ি করে আরজেএসসি পোর্টালে নেম ক্লিয়ারেন্স নিয়ে ২,০০০ টাকার স্ট্যাম্পে ফ্রেশ চুক্তিপত্র সম্পাদন করিয়ে ৫৮ ধারায় ফর্ম-১ দাখিল করা হয়।
  2. মাত্র ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে আরজেএসসি থেকে ফার্মের আনুষ্ঠানিক রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট হাসিল করা হয়, ফলে আইনের ৬৯ ধারার নিষেধাজ্ঞা দূর হয়।
  3. নতুন নিবন্ধিত ফার্মের প্যাডে কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর ১৫ দিনের কড়া লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয় এবং সাথে দেওয়ানি মানি স্যুটের ড্রাফট যুক্ত করে দেওয়া হয়।
  4. নিবন্ধিত ফার্ম আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে এবং কারখানা পরিচালকদের ব্যাংক হিসাব ক্রোক হতে পারে বুঝতে পেরে কারখানা কর্তৃপক্ষ আদালতে যাওয়ার আগেই আপোষের প্রস্তাব দেয় এবং ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ ৭০ লক্ষ টাকার ব্যাংক পে-অর্ডার পরিশোধ করতে বাধ্য হয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

অংশীদারি ফার্মের আরজেএসসি রেজিস্ট্রেশন করা কি বাধ্যতামূলক?

ব্যবসা শুরুর সময় বাধ্যতামূলক না হলেও আইনের ৬৯ ধারার কারণে এটি অপরিহার্য। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনো ক্লায়েন্টের কাছে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য আদালতে দেওয়ানি মামলা করা যায় না।

অংশীদারি ব্যবসায় সর্বোচ্চ কতজন পার্টনার হতে পারেন?

সাধারণ বাণিজ্যিক অংশীদারি ব্যবসার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২ জন এবং সর্বোচ্চ ২০ জন পার্টনার হতে পারেন। তবে ব্যাংকিং ব্যবসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা ১০ জন।

পার্টনারশিপ ডিডের জন্য কত টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প লাগে?

স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯ অনুযায়ী অংশীদারি চুক্তিপত্র অবশ্যই ঠিক ২,০০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদন ও নোটারি করতে হয়।

অংশীদারি আইনের ৬৯ ধারা কী?

৬৯ ধারা অনুযায়ী আনরেজিস্টার্ড পার্টনারশিপ ফার্ম কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে ১০০ টাকার বেশি বকেয়া আদায়ের জন্য দেওয়ানি আদালতে মামলা করার সমস্ত আইনগত অধিকার হারায়।

অংশীদারি ব্যবসায় কি ব্যক্তিগত সম্পদ ঝুঁকিতে থাকে?

হ্যাঁ। পার্টনারদের দায় অসীম (Unlimited Liability)। ফার্মের কোনো ঋণ পরিশোধে ব্যবসা ব্যর্থ হলে পার্টনারদের ব্যক্তিগত বাড়ি, জমি ও ব্যাংক হিসাব ক্রোক হতে পারে।

ফার্মের নামে কি আলাদা ই-টিন ও ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া যায়?

হ্যাঁ। আরজেএসসি রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পর পার্টনারদের নিজস্ব টিনের বাইরে ফার্মের নামে পৃথক ১২ ডিজিটের ই-টিন এবং সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়।

প্রবাসী ব্যক্তি কি দেশে না এসে পার্টনার হতে পারেন?

হ্যাঁ। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে চুক্তিপত্র বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়ন করে পাঠিয়ে এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে মূলধন জমা দিয়ে প্রবাসী ব্যক্তি পার্টনার হতে পারেন।

অংশীদারি ব্যবসা কীভাবে বিলুপ্ত করতে হয়?

সকল পার্টনারের পারস্পরিক সম্মতিতে অথবা দেওয়ানি আদালতে ৪৪ ধারায় মামলা করে ফার্ম বিলুপ্ত ঘোষণা করা যায় এবং দেনা-পাওনা নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

দায়বর্জন (Disclaimer): এই আর্টিকেলে পরিবেশিত তথ্যসমূহ কেবল আইনি সচেতনতা ও সাধারণ শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো প্রত্যক্ষ আইনি পরামর্শ (Legal Advice) নয় এবং এর মাধ্যমে কোনো আইনজীবী-মক্কেল সম্পর্ক (Attorney-Client Relationship) তৈরি হয় না। আপনার সুনির্দিষ্ট মামলার আইনি প্রতিকারের জন্য সরাসরি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বা জজ কোর্টের তালিকাভুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।
আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546  |  WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০