লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য ডেভেলপার কোম্পানি বা কোনো ব্যক্তির অনুকূলে একবার "অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি" (Irrevocable Power of Attorney) রেজিস্ট্রি করে দিলে সাধারণ নিয়মে তা একতরফাভাবে বাতিল করা যায় না। তবে পাওয়ার গ্রহীতা যদি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন, অর্থ আত্মসাৎ করেন, নির্ধারিত সময়ে ভবন নির্মাণ না করেন বা প্রতারণার আশ্রয় নেন, তবে তাকে আজীবন সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করতে দেওয়া আইনের উদ্দেশ্য নয়। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২ অনুযায়ী নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে অপ্রত্যাহারযোগ্য আমমোক্তারনামা বাতিল করার কার্যকর বিধান রয়েছে। বিস্তারিত গাইড নিচে তুলে ধরা হলো। আইনি পরামর্শে: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা মূলত দুই প্রকার:
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২-এর ধারা ২(২) এবং ধারা ৬ অনুযায়ী, কোনো পাওয়ার অপ্রত্যাহারযোগ্য হতে হলে দুটি মৌলিক উপাদান থাকতে হবে:
আইনের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ারের ক্ষেত্রে দাতা একক ইচ্ছায় আমমোক্তারনামা বাতিল করতে পারবেন না, যদি না গ্রহীতা স্বেচ্ছায় তা পরিত্যাগ করেন অথবা আদালতের মাধ্যমে তা বাতিল করা হয়।
অপ্রত্যাহারযোগ্য হলেও আইন কাউকে চিরস্থায়ী ব্ল্যাঙ্ক চেক প্রদান করে না। নিম্নলিখিত কারণগুলো বিদ্যমান থাকলে আদালত উক্ত পাওয়ার বাতিল ঘোষণা করেন:
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২-এর ধারা ১৪ অনুযায়ী অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার বাতিলের প্রথম আনুষ্ঠানিক ধাপ হলো বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে গ্রহীতাকে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো।
নোটিশে চুক্তিভঙ্গের সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে সাধারণত ৩০ (ত্রিশ) দিনের সময় দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক সমাধান বা বিরোধ নিষ্পত্তি (Mediation) না হলে পাওয়ার বাতিলকরণের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের চূড়ান্ত ঘোষণা প্রদান করা হয়।
আইন অনুযায়ী, যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মূল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল, সেখানেই বাতিলের দলিল নিবন্ধন করতে হয়।
তবে অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ারের ক্ষেত্রে গ্রহীতা নিজে উপস্থিত হয়ে স্বাক্ষর না করলে সাব-রেজিস্ট্রার একতরফা বাতিল দলিল রেজিস্ট্রি করতে অস্বীকৃতি জানান। এই পরিস্থিতিতে সাব-রেজিস্ট্রার বরাবর একটি লিখিত আপত্তি দাখিল করে অবিলম্বে দেওয়ানি আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়।
গ্রহীতা যদি নোটিশের পরও ক্ষমতা না ছাড়েন, তবে মূল মালিকের একমাত্র ও সর্বোচ্চ অকাট্য আইনি প্রতিকার হলো সহকারী জজ বা যুগ্ম জেলা জজ আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ (Specific Relief Act, 1877)-এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী দলিল বাতিলের মোকদ্দমা দায়ের করা।
মামলা চলাকালীন গ্রহীতা যাতে উক্ত পাওয়ার ব্যবহার করে তৃতীয় পক্ষের কাছে জমি বিক্রি করতে না পারেন, সেজন্য দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১ ও ২ নিয়ম অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction) প্রার্থনা করতে হয়। আদালত নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুর করলে গ্রহীতা সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন।
ডেভেলপার কোম্পানির সাথে ফ্ল্যাট তৈরির পাওয়ার নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে শুধু সাধারণ আইন নয়, রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ প্রয়োগ করা যায়। এই আইনের অধীনে আরবিট্রেশন বা সালিশের মাধ্যমে দ্রুত ক্ষতিপূরণ আদায় ও চুক্তি বাতিলের শক্তিশালী ব্যবস্থা রয়েছে।
অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিলের আইনি নোটিশ ড্রাফটিং, জমি হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা এবং আদালতে ৩৯ ধারায় মামলায় সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলমের সরাসরি আইনি সহায়তা নিন।
ডেভেলপারের অনুকূলে অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার দেওয়ার পর যদি সাইনিং মানি না দেয়, ফ্ল্যাটের অংশের দখল বুঝিয়ে না দেয় বা চুক্তি অমান্য করে, তবে জমির মালিক রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০-এর ৩০ ধারার অধীনে নোটিশ জারি করতে পারেন। নোটিশের ৩০ দিনের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে একই আইনের অধীনে গঠিত সালিশ ট্রাইব্যুনাল বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যায়, যেখানে অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অনেক প্রতারক পাওয়ার গ্রহীতা মূল জমির মালিকের অগোচরে অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ারটি ব্যাংকে জমা দিয়ে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যান। এই ভয়াবহ ফাঁদ থেকে বাঁচতে আমমোক্তারনামা দলিলের শর্তাবলীতে স্পষ্টাক্ষরে লিখে দিতে হবে: "ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি এই দলিলের ক্ষমতাবলে উক্ত সম্পত্তি কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নিকট বন্ধক রাখিয়া ঋণ গ্রহণ করিতে পারিবেন না।" এই একটি সতর্কতামূলক ধারা জমিকে ব্যাংক ক্রোক থেকে রক্ষা করে।
পাওয়ার গ্রহীতা যদি অন্যায়ভাবে দাতার সম্পত্তি ক্ষতিসাধন করেন বা অননুমোদিত ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন, তবে দাতা শুধুমাত্র পাওয়ার বাতিল করেই ক্ষান্ত হবেন না; তিনি উক্ত আর্থিক ক্ষতির সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ১৯ ধারা এবং ক্ষতিপূরণ আইনের সাধারণ বিধান মতে, গ্রহীতার অবৈধ কর্মকাণ্ডের ফলে মূল মালিকের যে আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে, দেওয়ানি আদালতের মামলায় ক্ষতিপূরণের ডিক্রি (Damages and Compensation) প্রার্থনা করা যায়। আদালত গ্রহীতার অন্যান্য সম্পত্তি ক্রোক করে উক্ত টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করেন।
দেওয়ানি আদালতে দলিল বাতিলের মামলা সাধারণত দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করেন। কিন্তু কৌশলগতভাবে যদি মামলার শুরুতেই আরজির সাথে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction) এবং অ্যাড-ইনটেরিম আদেশ গ্রহণ করা যায়, তবে গ্রহীতা তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। এরপর আদালত ৩৯ ধারার চূড়ান্ত শুনানি গ্রহণ করে রেজিস্ট্রি অফিসের বালাম বই থেকে উক্ত পাওয়ারের নিবন্ধন বাতিলের জন্য সাব-রেজিস্ট্রারের বরাবরে সুস্পষ্ট কোর্ট নোটিশ প্রেরণ করেন।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন প্লট ও ফ্ল্যাট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির চেয়ে কঠোর বিধিমালা প্রযোজ্য। ২০০৪ সালের বিশেষ প্রজ্ঞাপন এবং ২০১২ সালের আমমোক্তারনামা বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে রাজউকের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে কোনো অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কার্যকর হয় না। কোনো বরাদ্দের শর্ত লঙ্ঘন করে গোপনে পাওয়ার দলিলের মাধ্যমে প্লট হস্তান্তরের চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মূল বরাদ্দ বাতিল করে জমি সরকারের খাস দখলে নিয়ে নিতে পারে। তাই ডেভেলপার বা কোনো মধ্যস্থতাকারীকে পাওয়ার দেওয়ার পূর্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিজ দলিলের শর্তাবলী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিজ্ঞ সিভিল আইনজীবীর মাধ্যমে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া জমির মালিকের জন্য অপরিহার্য।
দেওয়ানি আদালতে মোকদ্দমা দায়ের ও সাব-রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত আপত্তি দাখিলের পাশাপাশি একটি অত্যন্ত কার্যকর সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হলো জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ্য গণবিজ্ঞপ্তি (Public Caution Notice) প্রচার করা। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টাক্ষরে উল্লেখ করতে হবে যে, উক্ত আমমোক্তারনামা দলিলের ক্ষমতাগ্রহীতা মারাত্মক শর্তভঙ্গ ও বিশ্বাসভঙ্গ করায় উক্ত দলিলের কার্যকারিতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান উক্ত বাতিলযোগ্য পাওয়ারের ভিত্তিতে কোনো আর্থিক লেনদেন বা জমি ক্রয়-বিক্রয় করলে তার আইনগত সমস্ত দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তৃতীয় পক্ষের ওপরই বর্তাবে। পরবর্তীতে কেউ দাবি করতে পারবে না যে সে সরল বিশ্বাসে জমি কিনেছে (Bona fide Purchaser without Notice)। সুপ্রিম কোর্টের নজির অনুযায়ী, এই ধরনের পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি ভবিষ্যতে যেকোনো তৃতীয় পক্ষের প্রতারণামূলক দাবি সরাসরি নস্যাৎ করতে অকাট্য দালিলিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।