পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রে (NID) নাম ও বয়স সংশোধনে কোর্ট এফিডেভিট ও নিয়ম ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-10

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশে লাখ লাখ নাগরিক প্রতিদিন যে সাধারণ অথচ চরম হয়রানিমূলক আইনি সমস্যার মুখোমুখি হন, তা হলো জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট এবং শিক্ষাগত সনদের মধ্যে নাম, পিতা-মাতার নাম কিংবা জন্মতারিখের গরমিল। বিশেষ করে যারা উচ্চশিক্ষা বা চাকরির উদ্দেশ্যে ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের ভিসা আবেদন করেন, তাদের ডকুমেন্টস একটু অমিল থাকলেই ভিসা রিজেক্ট হয়ে যায়। অনেকে স্থানীয় দালাল ধরে মাসের পর মাস ঘুরেও কাজ করাতে পারেন না। অথচ বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাসপোর্ট নীতিমালা এবং নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সংশোধন বিধিমালা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে হলফনামা (Court Affidavit) সম্পাদন করে এটি আইনসম্মতভাবে সংশোধন করা সম্ভব। জানুন ২০২৬ সালের হালনাগাদ নিয়ম ও পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা সেবা বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত সর্বশেষ পরিপত্র অনুযায়ী, নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর তথ্যের ভিত্তিতে পাসপোর্ট সংশোধন সহজতর করা হয়েছে। তবে যাদের শিক্ষাগত সনদ (SSC/Dakhil) রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত সনদই হবে বয়স ও নামের মূল মানদণ্ড।

📌 নীতিমালার মূল সারসংক্ষেপ

যাদের শিক্ষাগত সনদ নেই, তাদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং ১ম শ্রেণির জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হলফনামাই হলো বয়স ও নাম প্রমাণের একমাত্র আইনসম্মত দলিল। বয়স পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাধারণত ৫ বছরের বেশি অমিল হলে বিশেষ পুলিশ ভেরিফিকেশন ও স্পেশাল কমিটির অনুমোদন লাগে।

আইনানুযায়ী জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন ২০০৪ এবং পাসপোর্ট বিধিমালা অনুযায়ী যেকোনো নাগরিকের নাম ও বয়স পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি তার পরিচয় সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। দালালদের খপ্পরে পড়ে কোনো ভুয়া সার্টিফিকেট বা জাল কাগজপত্র তৈরি করলে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি, বিদেশের ভিসা এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় চরম ফৌজদারি শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে। তাই সর্বদা ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও সরকারের স্বীকৃত পোর্টালে সরাসরি ফি জমা দিয়ে স্বচ্ছভাবে কাজ সম্পন্ন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। নির্ভুল আইনি ড্রাফটিংই হলো যেকোনো জটিল সংশোধনের মূল চাবিকাঠি।

অনেকে সাধারণ নোটারি পাবলিক (Notary Public) দিয়ে ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে হলফনামা করিয়ে পাসপোর্ট অফিসে জমা দেন, যা প্রায়শই পাসপোর্ট অধিদপ্তর গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।

আইন অনুযায়ী পাসপোর্ট ও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ১ম শ্রেণির জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (Judicial Magistrate 1st Class) বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের নির্বাহী/জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীর শনাক্তকরণে (Identification) এফিডেভিট সম্পাদন করাই শতভাগ সুরক্ষিত। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের এফিডেভিটে কোর্টের গোল সিল ও ম্যাজিস্ট্রেটের সরকারি স্বাক্ষর থাকায় এটি কোনো সরকারি দপ্তর প্রত্যাখ্যান করতে পারে না।

ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে এফিডেভিট সম্পাদনের সময় আবেদনকারীর মূল আইডি ও শিক্ষাগত সনদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। বিজ্ঞ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবেদনকারীকে সশরীরে জেরা করে নিশ্চিত হন যে ঘোষণার প্রতিটি তথ্য সত্য ও সঠিক। এফিডেভিট সম্পাদনের পর আইনজীবী দ্বারা নোটারাইজড প্রতিলিপি সংরক্ষণ করা উচিত যা পাসপোর্ট অফিসে আবেদনের সময় মূল কপির সাথে সহায়ক প্রমাণ হিসেবে প্রদর্শিত হয়। কোনো অসত্য তথ্য দিয়ে এফিডেভিট সম্পাদন করলে দণ্ডবিধির ১৯৩ ও ১৯৯ ধারা অনুযায়ী ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে, তাই সঠিক তথ্য প্রদান করাই একমাত্র আইনসম্মত পন্থা।

সংশোধনের ধরন অনুযায়ী কী কী প্রমাণপত্র আদালতে ও পাসপোর্ট অফিসে দাখিল করতে হয় তা নিচে তুলে ধরা হলো:

সংশোধনের ধরনপ্রয়োজনীয় অকাট্য আইনি ডকুমেন্টসনিষ্পত্তির আনুমানিক সময়
১. নিজের নামের বানান সংশোধনএসএসসি সনদ, জন্ম নিবন্ধন, পিতা-মাতার এনআইডি ও ম্যাজিস্ট্রেট এফিডেভিট১৫ থেকে ৩০ কর্মদিবস
২. পিতা বা মাতার নাম পরিবর্তনপিতা-মাতার মূল এনআইডি, ওয়ারিশান সনদ ও এফিডেভিট৩ থেকে ৬ সপ্তাহ
৩. জন্মতারিখ ও বয়স সংশোধনশিক্ষাগত সনদ অথবা মেডিকেল সার্টিফিকেট ও ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট হলফনামা১ থেকে ২ মাস (ভেরিফিকেশন সাপেক্ষে)

দালাল ছাড়াই সঠিক নিয়মে নিজের সংশোধন নিজে করতে নিচের ৪টি ধাপ অনুসরণ করুন:

  1. ধাপ ১: আইনজীবীর মাধ্যমে এফিডেভিট প্রস্তুত: ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সঠিক কারণ ও পূর্ববর্তী ভুল ব্যাখ্যার বিবরণ দিয়ে এফিডেভিট ড্রাফট করুন।
  2. ধাপ ২: ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বশরীরে হলফনামা সম্পাদন: বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে গিয়ে শপথ গ্রহণ ও স্বাক্ষর করুন।
  3. ধাপ ৩: জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ: একটি বহুল প্রচারিত জাতীয় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকে 'নাম/বয়স পরিবর্তন বিষয়ক আইনি বিজ্ঞপ্তি' প্রকাশ করুন।
  4. ধাপ ৪: সরকারি ফি জমা দিয়ে আবেদন: নির্বাচন কমিশনের এনআইডি পোর্টালে বা পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সিস্টেমে রি-ইস্যু আবেদন ফরমের সাথে এফিডেভিট ও পেপারের কাটিং আপলোড করে পাসপোর্ট অফিসে বায়োমেট্রিক দিন।

যদি কোনো ব্যক্তি তার নাম আমূল পরিবর্তন করেন (যেমন: পূর্বের নাম পুরোপুরি বদলে নতুন নাম গ্রহণ), তবে কেবল এফিডেভিটই যথেষ্ট নয়; বিজি প্রেস (বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়) থেকে সরকারি গেজেট (Official Gazette) প্রকাশ করা আবশ্যক।

গেজেট নোটিফিকেশন থাকলে আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন ও দূতাবাস কোনো আপত্তি তুলতে পারে না। পাসপোর্ট আবেদনের পর স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB) পুলিশ ভেরিফিকেশনে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের এফিডেভিট ও গেজেট প্রদর্শন করলেই ক্লিয়ারেন্স রিপোর্ট পজিটিভ হিসেবে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

হলফনামা বা এফিডেভিট হলো আদালতে শপথপূর্বক লিখিত সত্য ঘোষণার দলিল। এফিডেভিটে আবেদনকারীর নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এবং পূর্ববর্তী ভুলের কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করতে হবে। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হবে যে: "আমি অমুক, সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় ঘোষণা করিতেছি যে, আমার শিক্ষাগত সনদ/জন্ম সনদে আমার নাম অমুক এবং জন্মতারিখ অমুক সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ রহিয়াছে। ভুলবশত আমার পূর্বের পাসপোর্ট/জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ বা নামের বানান ভিন্নভাবে লিপিবদ্ধ হইয়াছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে কোনো ধরনের আর্থিক বা ফৌজদারি দায় এড়ানোর অসৎ উদ্দেশ্য নাই।" এই ঘোষণার শেষে অ্যাডভোকেট কর্তৃক শনাক্তকারী হিসেবে স্বাক্ষর এবং বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের সিলমোহরযুক্ত স্বাক্ষর সম্পাদন করতে হয়।

বয়স বা নামের বড় ধরনের সংশোধনের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট জেলার স্পেশাল ব্রাঞ্চে (SB) অথবা মেট্রোপলিটনে ডিএসবি-তে গোপন তদন্তের ফাইল পাঠানো হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা সাধারণত আবেদনকারীকে সশরীরে মূল ডকুমেন্টস সহ দেখা করতে বলেন। পুলিশ ভেরিফিকেশন সফল করতে ৩টি বিষয় খেয়াল রাখবেন: (১) এলাকার অন্তত দুজন স্থানীয় সম্মানিত ব্যক্তি বা জনপ্রতিনিধির প্রত্যয়নপত্র সঙ্গে রাখা, (২) জমিজমা বা পৈতৃক দলিলের সার্টিফায়েড কপি সঙ্গে রাখা যেখানে পিতা-মাতার সঠিক নাম উল্লেখিত আছে, এবং (৩) এফিডেভিটের মূল কপি ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের কাটিং প্রদর্শন করা। ডকুমেন্টস নিখুঁত থাকলে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে পজিটিভ ক্লিয়ারেন্স প্রধান কার্যালয়ে পৌঁছে যায়।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত দ্বৈত নাগরিক ও প্রবাসীদের পাসপোর্টে নাম বা জন্মতারিখের গরমিল থাকলে বিদেশের ইমিগ্রেশন ও নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ায় চরম জটিলতা তৈরি হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে সংশোধনীর জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার জেনারেলের সত্যায়িত এফিডেভিট এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের বিশেষ ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন হয়।

যদি প্রবাসে অর্জিত কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স বা স্থানীয় আইডি কার্ডের সাথে বাংলাদেশি পাসপোর্টের অমিল থাকে, তবে নোটারি এফিডেভিটের পরিবর্তে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের 'ঘোষণামূলক আদেশ' (Declaratory Order) নিয়ে সুরক্ষা সেবা বিভাগে স্পেশাল পিটিশন দাখিল করতে হয়। মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রমাণাদি সন্তোষজনক পেলে বিদেশের মিশনে সরাসরি ই-পাসপোর্ট রি-ইস্যুর অনাপত্তি সনদ (NOC) প্রেরণ করে।

যদি পাসপোর্ট অফিস বা নির্বাচন কমিশন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের এফিডেভিট প্রদর্শনের পরও কোনো জটিলতার কারণে নাম বা বয়স সংশোধন প্রত্যাখ্যান করে, তবে সংক্ষুব্ধ নাগরিকের সামনে সবচেয়ে চূড়ান্ত আইনি বিকল্প হলো দেওয়ানি আদালতে 'ঘোষণামূলক মোকদ্দমা' (Declaration Suit) দায়ের করা।

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ (Specific Relief Act)-এর ৪২ ধারা অনুযায়ী সহকারী জজ আদালতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে (পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও নির্বাচন কমিশন) বিবাদী করে ঘোষণা চাওয়া হয় যে, "আবেদনকারীর প্রকৃত নাম ও জন্মতারিখ যাহা শিক্ষাগত সনদ ও জন্ম সনদে লিপিবদ্ধ রহিয়াছে, তাহাই তাহার আইনগত একমাত্র পরিচয়।" দেওয়ানি আদালত বিচার শেষে যখন এই মর্মে ঘোষণামূলক ডিক্রি জারি করেন, তখন সরকারি কর্তৃপক্ষ উক্ত ডিক্রি মোতাবেক পাসপোর্ট ও এনআইডি সংশোধন করতে আইনত সম্পূর্ণ বাধ্য থাকে।

⚖️ এফিডেভিট ও পাসপোর্ট আইনি জটিলতায় বিশ্বস্ত সমাধান

এফিডেভিটের ভাষা ও ধারায় সামান্য ভুল থাকলে পাসপোর্ট অফিস তা বাতিল করে দিতে পারে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্র্যাকটিসিং আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট এফিডেভিট ড্রাফটিং, নাম-বয়স সংশোধন ও পাসপোর্ট জটিলতা নিরসনে আইনানুগ সহায়তা প্রদান করে আসছেন।

সরাসরি চেম্বার পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন:
📞 ফোন / হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৭১২৬৫৫৫৪৬ (01712655546)
📍 চেম্বার: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ভবন, ঢাকা।