পৌরসভা এলাকায় জমি রেজিস্ট্রি খরচ হিসাব ২০২৬ — সাব-রেজিস্ট্রি ফি, উৎসে কর ও গেজেট নিয়ম

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

<p>জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ হলো সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বৈধভাবে দলিল রেজিস্ট্রি সম্পাদন করা। গ্রাম্য ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার তুলনায় পৌরসভা (ক, খ, গ শ্রেণী) এলাকায় জমি রেজিস্ট্রির সরকারি ফি ও করের কাঠামো ভিন্ন। আয়কর আইন ২০২৩ ও হালনাগাদ অর্থ আইন অনুযায়ী মৌজা মূল্য ও উৎসে করের পরিবর্তনের কারণে অনেকেই সঠিক খরচের হিসাব না জেনে দালাল চক্রের হাতে অতিরিক্ত অর্থ খুইয়ে থাকেন। পৌরসভা এলাকার নিখুঁত রেজিস্ট্রি খরচের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো। আইনি পরামর্শের জন্য: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>

বাংলাদেশে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয় রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ (Registration Act, 1908), সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ (Transfer of Property Act, 1882) এবং স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯-এর অধীনে। জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ধরন (ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, নাকি সিটি কর্পোরেশন) অনুসারে করের হারে পার্থক্য থাকে।

পৌরসভা এলাকার জমিকে বাণিজ্যিক ও নাগরিক সুবিধার আওতাভুক্ত হিসেবে গণ্য করায় এখানকার মৌজা রেট এবং স্থানীয় সরকার কর সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদের তুলনায় বেশি হয়।

পৌরসভা এলাকায় একটি সাফ-কবলা (বিক্রয়) দলিল রেজিস্ট্রি করতে হলে সরকারিভাবে প্রধানত ৫টি খাতে ফি পরিশোধ করতে হয়:

খাতের নাম সরকারি হার (পৌরসভা এলাকা) পরিশোধের মাধ্যম
১. রেজিস্ট্রেশন ফি১%বাংলাদেশ ব্যাংক/সোনালী ব্যাংকে চালান/পে-অর্ডার
২. স্ট্যাম্প শুল্ক (Stamp Duty)১.৫%চালানের মাধ্যমে বা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে
৩. স্থানীয় সরকার কর (পৌর কর)২% (কতিপয় ক্ষেত্রে ৩%)সংশ্লিষ্ট পৌরসভার অনুকূলে ব্যাংক ড্রাফট/চালান
৪. উৎস আয়কর (Source Tax)২% - ৪% (এলাকাভেদে)এনবিআর চালান কোডে জমা
৫. হলফনামা ও ই-ফিনির্ধারিত (৩০০ টাকা + ১০০ টাকা)স্ট্যাম্প ও নগদ
সর্বমোট আনুমানিক হার৭.৫% থেকে ৮.৫%দলিল মূল্যের ওপর

স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন ২০০৯ অনুযায়ী প্রতিটি জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পৌরসভার উন্নয়ন তহবিলের জন্য ২% কর কর্তন করা হয়। যদি জেলা সদর বা বিশেষ 'ক' শ্রেণীর পৌরসভা হয়, তবে সরকার বিজ্ঞপ্তিমূলে তা সর্বোচ্চ ৩% পর্যন্ত ধার্য করতে পারে। এই টাকা সরাসরি স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষের তহবিলে রাস্তাঘাট ও নাগরিক সুবিধার উন্নয়নে জমা হয়।

আয়কর আইন ২০২৩-এর ১২০ ধারার অধীনে স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর বিক্রেতার কাছ থেকে উৎসে আয়কর কাটার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে জমি ক্রয়ের সময় ক্রেতাই এই কর পরিশোধ করে দলিল রেজিস্ট্রি করেন।

📌 পৌরসভায় উৎসে করের হার

  • জেলা সদরে অবস্থিত পৌরসভা: দলিল মূল্যের ৪% অথবা কাঠা প্রতি নির্দিষ্ট স্ল্যাব রেট (যেটি বেশি)।
  • উপজেলা পর্যায়ে অবস্থিত অন্যান্য সাধারণ পৌরসভা: দলিল মূল্যের ২% থেকে ৩%।
  • কৃষি জমির ক্ষেত্রে পৌর এলাকায় উৎসে করের ছাড় কিছুটা সীমিত থাকে।

এলাকার ধরন রেজিস্ট্রেশন ফি স্ট্যাম্প ডিউটি স্থানীয় কর মোট আনুমানিক খরচ
ইউনিয়ন পরিষদ (গ্রাম্য এলাকা)১%১.৫%১%৬.৫% - ৭.৫%
পৌরসভা এলাকা১%১.৫%২% - ৩%৭.৫% - ৯%
সিটি কর্পোরেশন / রাজউক এলাকা১%১.৫%২% - ৩%১০% - ১২%+

ধরা যাক, আপনি একটি জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় ১০,০০,০০০ (দশ লাখ) টাকা মূল্যের একটি আবাসিক প্লট ক্রয় করছেন। আপনার মোট সরকারি খরচ কত হবে?

📊 ১০ লাখ টাকার জমিতে পৌরসভা রেজিস্ট্রি খরচ:

  • রেজিস্ট্রেশন ফি (১%) = ১০,০০০ টাকা
  • স্ট্যাম্প শুল্ক (১.৫%) = ১৫,০০০ টাকা
  • পৌরসভা কর (২%) = ২০,০০০ টাকা
  • উৎস আয়কর (৩%) = ৩০,০০০ টাকা
  • হলফনামা, এন-ফি ও আনুষঙ্গিক = ১,৫০০ টাকা
  • মোট প্রকৃত সরকারি খরচ = ৭৬,৫০০ টাকা (প্রায় ৭.৬৫%)

যদি জমির সরকারি মূল্য ৫০,০০,০০০ (পঞ্চাশ লাখ) টাকা হয়, তবে একই অনুপাতে মোট সরকারি খরচ দাঁড়াবে আনুমানিক ৩,৮২,৫০০ টাকা।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল লেখক (মুহুরি) এবং মধ্যস্বত্বভোগী দালালরা প্রায়ই "অফিস খরচ" বা "টেবিল মানি"-র নামে সরকারি ফির দ্বিগুণ বা তিনগুণ টাকা দাবি করেন। এই প্রতারণা এড়াতে করণীয়:

  1. সরকারি চালান ব্যাংকে নিজে জমা দিন: স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি ও উৎসে করের টাকা সরাসরি সোনালী ব্যাংকে চালানের মাধ্যমে জমা দিয়ে আসল রসিদ সংগ্রহ করুন।
  2. সরকারি ফি চার্ট যাচাই: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নোটিশ বোর্ডে টাঙানো সরকারি ফির তালিকার সাথে নিজের হিসাব মিলিয়ে নিন।
  3. দলিল লেখকের সরকারি পারিশ্রমিক: দলিল লেখকের সরকার নির্ধারিত একটি সুনির্দিষ্ট পারিশ্রমিক রয়েছে। অতিরিক্ত দাবি করলে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ জানানো যায়।

⚖️ নিরাপদ জমি রেজিস্ট্রিতে অভিজ্ঞ আইনজীবীর মতামত নিন

পৌরসভা এলাকায় জমি কেনার পূর্বে সিএস, এসএ, আরএস খতিয়ান যাচাই, নামজারি ট্র্যাকিং এবং দলিলের নির্ভুল ড্রাফটিংয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ ভূমি আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলমের সুচিন্তিত আইনি মতামত গ্রহণ করুন।

📞 সরাসরি কল: 01712655546 💬 WhatsApp পরামর্শ 📍 চেম্বার ঠিকানা

সাফ-কবলা বা বিক্রয়ের তুলনায় রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়দের মধ্যে দান বা হেবা করলে পৌরসভা এলাকায় সরকারি রেজিস্ট্রেশন খরচ বহুলাংশে হ্রাস পায়:

🎁 দান ও হেবা দলিলের স্বল্প ফি সুবিধা

  • মুসলিম হেবা দলিল (রক্তসম্পর্কীয়): পিতা-মাতা, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী ও সহোদর ভাই-বোনের মধ্যে জমি হেবা করলে স্ট্যাম্প শুল্ক ও রেজিস্ট্রেশন ফি মাত্র ১০০ টাকা নির্ধারিত। কোনো পৌর কর বা উৎসে আয়কর প্রযোজ্য হয় না।
  • সাধারণ দানপত্র (Gift Deed): অন্যান্য আত্মীয়দের ক্ষেত্রে দলিলের মূল্যের ১.৫% স্ট্যাম্প শুল্ক এবং ১% রেজিস্ট্রেশন ফি প্রযোজ্য হয়, তবে বাণিজ্যিক উৎসে করের ছাড় পাওয়া যায়।
  • আপস বণ্টননামা দলিল: ওয়ারিশদের মধ্যে বাটোয়ারা দলিলের ক্ষেত্রে নামমাত্র নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়ে পৌরসভা এলাকায় জমি ভাগাভাগি সম্পন্ন করা যায়।

২০২৬ সালে জমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় ডিজিটালাইজেশনের আওতায় সোনালী ব্যাংকের ই-পেমেন্ট গেটওয়ে এবং land.gov.bd-এর মাধ্যমে ঘরে বসেই সরকারি ফি-র ই-চালান জেনারেট করা যায়। এতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারীদের হাতে নগদ অর্থ লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চালান ফরমে সঠিক হেড অব অ্যাকাউন্ট এবং জমির সঠিক দাগ-খতিয়ান উল্লেখ নিশ্চিত করলে কোনো প্রকার অতিরিক্ত অর্থ অপচয় ছাড়াই স্বচ্ছভাবে দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়।

পৌরসভা এলাকায় শুধুমাত্র ফাঁকা জমি নয়, নির্মিত ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক স্পেস রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে কর কাঠামোর ভিন্নতা রয়েছে:

🏢 ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির কর কাঠামো

  • স্কয়ার ফিট হিসেবে মূল্যায়ন: ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে মৌজা মূল্যের পাশাপাশি রাজউক বা পৌরসভা অনুমোদিত প্ল্যানের স্কয়ার ফিট আয়তনের ওপর ভিত্তি করে সরকারি মূল্যায়ন ধার্য করা হয়।
  • গেইন ট্যাক্স ও মূসক (VAT): ডেভেলপার কোম্পানি কর্তৃক নির্মিত নতুন ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট বা মূসক চালান জমা দিতে হয়।
  • অবিভক্ত ও অদখলীয় ভূমির হিস্যা (Undivided Proportionate Land): ফ্ল্যাটের দলিলের সাথে সংশ্লিষ্ট ভবনের মাটির আনুপাতিক অংশের দলিল সম্পাদন বাধ্যতামূলক, যা রেজিস্ট্রেশন ফিতে প্রভাব ফেলে।

টাকা পরিশোধ বা সাব-রেজিস্ট্রারে যাওয়ার পূর্বে ক্রেতাকে অবশ্যই নিচের ৫টি পরীক্ষা শেষ করতে হবে:

  1. খতিয়ানের ধারাবাহিকতা: সিএস থেকে শুরু করে এসএ, আরএস এবং সর্বশেষ সিটি বা বিএস জরিপ পর্যন্ত মালিকানার চেইন মিলিয়ে দেখা।
  2. সর্বশেষ খাজনা রসিদ (DCR & Dakhila): চলতি বাংলা সালের ভূমি উন্নয়ন কর হালনাগাদ পরিশোধ আছে কিনা তা ভূমি অফিসের অনলাইন পোর্টালে যাচাই করা।
  3. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাশ (Search Report): বিগত ১২ বছরে বিক্রেতা জমিটি অন্য কারো কাছে গোপনে বিক্রি বা ব্যাংকে দায়বদ্ধ রেখেছেন কিনা তা ১২ বছরের নির্দায় সনদ (Non-Encumbrance Certificate বা NEC) তুলে নিশ্চিত হওয়া।
  4. সরেজমিন দখল যাচাই: জমিটি বাস্তবে বিক্রেতার দখলে আছে কিনা, নাকি কোনো শরিক বা অবৈধ দখলদারের দখলে রয়েছে তা সরেজমিনে যাচাই করা।
  5. পৌরসভার হোল্ডিং ও অনুমোদন: পৌরসভা থেকে ভবনের প্ল্যান পাশ এবং বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের ছাড়পত্র দেখা।

পৌরসভা এলাকার জমি ক্রয়ের পূর্বে কেবলমাত্র সাব-রেজিস্ট্রারের দলিলের খরচ জানাই যথেষ্ট নয়, বরং জমিটির ওপর কোনো ভবিষ্যৎ সরকারি অধিগ্রহণ বা পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যানজনিত বাধা রয়েছে কিনা তা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার পৌরসভা বিধিমালা অনুযায়ী, রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য রাস্তার সীমানা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব (Setback Rule) বজায় রেখে বাড়ি নির্মাণ বাধ্যতামূলক। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বা খুলনা সংলগ্ন পৌরসভাগুলোতে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (যেমন রাজউক, সিডিএ, আরডিএ, কেডিএ)-এর মাস্টারপ্ল্যান জোনিং ম্যাপ যাচাই করে আবাসিক বনাম বাণিজ্যিক জমির ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হয়। ড্রেনেজ ও জলাশয় ভরাট করা জমি হলে ভবিষ্যতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও আদালতের আদেশে নির্মাণ কাজ স্থগিত হতে পারে, তাই রেজিস্ট্রি সম্পন্নের পূর্বেই স্থানীয় পৌর প্রকৌশলী বিভাগ থেকে সাইট প্ল্যানের অনাপত্তি নিশ্চিত করা বুদ্ধিমানের কাজ।