মামলা বা জিডি থাকলে কি পাসপোর্ট ও ভিসা পাওয়া যায়? পুলিশ ভেরিফিকেশন ও আদালতের পারমিশন ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

<p>বিদেশে উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা জীবিকার তাগিদে চাকরির অফার লেটার হাতে আসার পর সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্তে যখন জানা যায় যে অতীতে রাজনৈতিক হয়রানি, জমিজমার বিরোধ বা শত্রুভাবাপন্ন কারো করা একটি মিথ্যা মামলার কারণে পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট আটকে গেছে এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে চিঠি দিয়ে পাসপোর্ট স্থগিত (Passport On Hold) করা হয়েছে, তখন একজন নাগরিকের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সমস্ত দরজা যেন মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায়। ভুক্তভোগীদের মনে তখন চরম হাহাকার তৈরি হয়—<em>"আমার বিরুদ্ধে তো শুধু এফআইআর হয়েছে, আমি জামিনে আছি, এখনো কোনো সাজা হয়নি; তবুও কেন আমার পাসপোর্ট আটকে দিল? আমি কি আদালতের অনুমতি নিয়ে পাসপোর্ট পেতে পারি? এবং পুলিশ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নেগেটিভ রিপোর্ট দেয় তবে কি হাইকোর্টে রিট করা যাবে?"</em> বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ ১৯৭৩ (The Bangladesh Passport Order, 1973), সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক রায় এবং বিচারিক আদালত থেকে অনাপত্তিপত্র (Court NOC) সংগ্রহের মাধ্যমে বিচারাধীন মামলা থাকা সত্ত্বেও আইনানুগভাবে শতভাগ পাসপোর্ট ও ভিসা নিশ্চিত করার সম্পূর্ণ আইনি নির্দেশিকা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের দেশের অভ্যন্তরে অবাধ চলাফেরা এবং দেশ ত্যাগ ও দেশে পুনঃপ্রবেশ করার নিরঙ্কুশ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আর আন্তর্জাতিকভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে গমনের একমাত্র আইনি পরিচয়পত্র হলো পাসপোর্ট। অতএব, পাসপোর্ট পাওয়া কোনো সরকারি কর্মকর্তার দয়া বা অনুকম্পা নয়; এটি নাগরিকের জন্মগত ও সাংবিধানিক অধিকার।

দুর্ভাগ্যবশত, পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের দায়িত্বে থাকা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB) বা ডিএসবি অনেক সময় কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে নিছক একটি বিরোধ বা মিথ্যা মামলার খবর পেলেই পাসপোর্টে নেগেটিভ মন্তব্য (Adverse Police Report) পাঠিয়ে দেয়। পাসপোর্ট অধিদপ্তরও কোনো যাচাই-বাছাই না করে ফাইল হোল্ড করে রাখে। কিন্তু আইনের আশ্রয় নিলে এই প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা মুহূর্তেই প্রতিহত করা সম্ভব।

১৯৭৩ সালের বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশের ৫ ও ৭ ধারায় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কোন কোন ক্ষেত্রে সরকার পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যান বা বাতিল করতে পারে:

  • আবেদনকারী যদি বাংলাদেশের নাগরিক না হন।
  • কোনো ব্যক্তি যদি নৈতিক স্খলনজনিত গুরুতর অপরাধে আদালত কর্তৃক কমপক্ষে ২ (দুই) বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং মুক্তির পর ৫ বছর অতিক্রান্ত না হয়ে থাকে।
  • আবেদনকারীর বিরুদ্ধে যদি উপযুক্ত আদালত কর্তৃক সরাসরি দেশত্যাগে সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার পরোয়ানা জারি থাকে।

সুতরাং আইন খুব স্পষ্ট: আপনার বিরুদ্ধে যদি কোনো মামলা চলমান থাকে কিন্তু আপনি দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২ বছরের কারাদণ্ড না পান এবং আদালতের দেশত্যাগের কোনো সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকে, তবে পাসপোর্ট বাতিল করার কোনো আইনি এখতিয়ার পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নেই।

সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো জিডি নিয়ে। জমিজমার সীমানা নিয়ে প্রতিবেশীর সাথে জিডি হয়েছে বা দাম্পত্য কলহে স্ত্রী থানায় একটি অভিযোগ দিয়ে রেখেছে—অনেকেই ভাবেন এর জন্য বোধহয় পাসপোর্ট হবে না।

আইনগত সত্য: সাধারণ ডায়েরি (GD) কোনো ফৌজদারি বিচার বা মামলার অভিযোগপত্র নয়; এটি কেবল একটি তথ্য ডায়েরি। জিডি থাকার কারণে কোনো ব্যক্তির পুলিশ ভেরিফিকেশন নেগেটিভ হতে পারে না এবং পাসপোর্ট আটকানো সম্পূর্ণরূপে বেআইনি।

যদি কোনো থানায় আপনার বিরুদ্ধে একটি এফআইআর দায়ের হয় এবং মামলাটি এখনো পুলিশ তদন্তাধীন অবস্থায় থাকে (অর্থাৎ আদালতে আনুষ্ঠানিক পুলিশ প্রতিবেদন বা চার্জশিট দাখিল হয়নি), তবে আইনের চোখে আপনি সম্পূর্ণরূপে একজন নির্দোষ নাগরিক (Presumed Innocent)। আপনি যদি বিজ্ঞ আদালত থেকে নিয়মিত জামিনে থাকেন, তবে পাসপোর্ট অধিদপ্তর আপনার পাসপোর্ট আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট জামিনের কাগজপত্র প্রদর্শন করলে পাসপোর্ট ক্লিয়ার হয়ে যায়।

যদি মামলায় তদন্ত শেষে চার্জশিট দাখিল হয়ে থাকে এবং বিজ্ঞ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়রা জজ আদালতে মামলাটি ট্রায়াল বা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে থাকে, তবে পাসপোর্ট অধিদপ্তর পাসপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে আদালতের ক্লিয়ারেন্স দাবি করে।

এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে সঠিক ও নিরাপদ আইনি পথ হলো—যে আদালতে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে, সেই আদালতের বিজ্ঞ বিচারকের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে পাসপোর্টের অনুমতি বা নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (Court NOC)-এর দরখাস্ত দাখিল করা।

আদালতে দরখাস্ত দাখিল ও শুনানির জন্য অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীর মাধ্যমে নিম্নোক্ত তথ্যসমূহ উপস্থাপন করতে হয়:

  1. আবেদনকারী আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রতিটি ধার্য তারিখে নিয়মিত আদালতে হাজিরা প্রদান করছেন।
  2. আবেদনকারীর বিদেশে চাকরি, ভিসা নবায়ন, বিদেশে উন্নত চিকিৎসা বা উচ্চশিক্ষার সুযোগ এসেছে এবং পাসপোর্ট না পেলে তার জীবন ও ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে।
  3. আবেদনকারী আদালতের নির্দেশমতো যেকোনো অঙ্কের জামিননামা মুচলেকা (Security Bond) প্রদান করতে এবং মামলার বিচারের সময় যথানিয়মে উপস্থিত হতে প্রস্তুত।

বিজ্ঞ বিচারক মানবিক দিক ও নাগরিকের অধিকার বিবেচনা করে পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে "আবেদনকারীর অনুকূলে পাসপোর্ট প্রদানে আদালতের কোনো আপত্তি নেই" মর্মে সুনির্দিষ্ট আদেশ বা এনওসি প্রদান করেন।

আদালতের আদেশের মূল প্রত্যয়িত নকল (Certified Copy) উত্তোলন করার পর তা পাসপোর্ট অফিসে দাখিল করতে হবে:

  • আদালতের সার্টিফাইড আদেশের কপি এবং ওকালতনামার রসিদ সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক (DD) বরাবরে একটি আবেদন দাখিল করুন।
  • পাসপোর্ট অফিসের লিগ্যাল উইং আদালতের আদেশটি সংশ্লিষ্ট আদালতের সাথে ফ্যাক্স বা স্পেশাল মেসেঞ্জারে যাচাই করে নেয়।
  • যাচাই শেষে পাসপোর্ট সার্ভারের সফটওয়্যারে থাকা "Hold / Blocked" স্ট্যাটাসটি আনলক (Unlock) করে দেওয়া হয় এবং কয়েকদিনের মধ্যে পাসপোর্ট প্রিন্ট হয়ে ডেলিভারি কাউন্টারে চলে আসে।

আদালতের জামিন ও এনওসি থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বহীন কর্মকর্তাদের লালফিতার দৌরাত্ম্যে ফাইল মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা হয়। ভিসা বা স্কলারশিপের ডেডলাইন যখন চলে যেতে বসে, তখন সবচেয়ে অব্যর্থ ব্রহ্মাস্ত্র হলো বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করা।

হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটের মোশন শুনানির প্রথম দিনেই বিজ্ঞ বিচারপতিরা পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (DG) ও স্বরাষ্ট্র সচিবের প্রতি রুল জারি করেন এবং মাত্র ১৫ দিন থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে আবেদনকারীকে পাসপোর্ট হস্তান্তরের সরাসরি নির্দেশ (Mandamus) প্রদান করেন। হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করার সাহস কোনো পাসপোর্ট কর্মকর্তার থাকে না।

যদি কোনো ব্যক্তি বিচারিক আদালতে কোনো মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হন, তবে তার ক্ষেত্রে কী হবে? পাসপোর্ট আদেশের ধারা ৭ অনুযায়ী সাজা যদি ২ বছরের কম হয়, তবে কোনো বাধা নেই। আর যদি সাজা ২ বছর বা তার বেশি হয়, তবুও আসামি যদি উচ্চ আদালতে উক্ত সাজার রায়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি আপিল (Criminal Appeal) দায়ের করে উচ্চ আদালত থেকে সাজার আদেশ স্থগিত (Stay of Conviction and Sentence) এবং জামিন আদেশ লাভ করেন, তবে উচ্চ আদালতের আদেশের জোরে তিনি পাসপোর্ট পাওয়ার আইনি অধিকারী হন।

পাসপোর্ট প্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকার সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের প্রধান মাইলফলক রায়সমূহ:

১. ড. কামাল হোসেন বনাম বাংলাদেশ (44 DLR): সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়ে ঘোষণা করা হয় যে, পাসপোর্ট প্রাপ্তি নাগরিকের স্বাধীনভাবে চলাফেরার সাংবিধানিক অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ; যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ও নোটিশ ছাড়া কোনো নাগরিকের পাসপোর্ট অস্বীকার করা অসাংবিধানিক ও বেআইনি।

২. মোঃ আকতারুজ্জামান বনাম স্বরাষ্ট্র সচিব (56 DLR AD): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, নিছক রাজনৈতিক বা হয়রানিমূলক মামলার অজুহাতে পুলিশ বা পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ কোনো বৈধ নাগরিকের পাসপোর্ট আটকে রাখতে পারে না।

পাসপোর্টে মামলার জটিলতা তৈরি হলে দ্রুত নিচের কাগজপত্রগুলো প্রস্তুত করুন:

  • ১. বিচারাধীন মামলার এফআইআর/নালিশ এবং সর্বশেষ জামিন আদেশের সার্টিফাইড কপি।
  • ২. মামলা চলমান আদালত কর্তৃক প্রদত্ত অনাপত্তিপত্র (Court NOC)-এর মূল আদেশ।
  • ৩. পাসপোর্ট আবেদনের অনলাইন ডেলিভারি স্লিপ ও পাসপোর্ট অফিসের চিঠি (যদি দিয়ে থাকে)।
  • ৪. বিদেশে চাকরি, স্কলারশিপ বা মেডিকেল ভিসার আমন্ত্রণপত্রের রঙিন প্রিন্টআউট।
  • ৫. পাসপোর্ট অফিস গড়িমসি করলে সুপ্রিম কোর্টে রিট করার জন্য একজন দক্ষ রিট আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ।

কোনো মামলা থাকার কারণে নিজের লালিত স্বপ্ন ও বিদেশের ক্যারিয়ার নষ্ট হতে দেবেন না। মিথ্যা মামলা থাকলে পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে লুকিয়ে থাকবেন না। আইন আপনাকে আত্মপক্ষ সমর্থন এবং নাগরিক সুবিধা ভোগ করার পূর্ণ অধিকার দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট জজ আদালতের মাধ্যমে আইনি এনওসি সংগ্রহ করুন অথবা সময় নষ্ট না করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন ফাইল করুন। সংবিধান ও উচ্চ আদালত আপনার পাশে রয়েছে; সঠিক আইনি পদক্ষেপে আপনার পাসপোর্ট আপনার হাতে আসবেই।

পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পরও অনেক সময় দেখা যায় কোনো নাগরিক যখন বিমানবন্দর বা স্থলবন্দর দিয়ে বিদেশ যেতে যান, তখন ইমিগ্রেশন পুলিশ সার্ভারে কোনো স্থগিতাদেশ (Lookout Circular / Stop List) দেখিয়ে বিদেশযাত্রা আটকে দেয় বা ফ্লাইট মিস করায়। এই ধরনের অতর্কিত বিপদ থেকে রক্ষা পেতে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ হলো: বিচারাধীন মামলায় নিয়মিত জামিনে থাকা অবস্থায় বিদেশ যাওয়ার কমপক্ষে ১৫ দিন আগে সংশ্লিষ্ট ট্রায়াল কোর্টে একটি বিশেষ ভ্রমণের আবেদন (Application for Permission to Travel Abroad) দাখিল করুন। বিজ্ঞ আদালত সুনির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য (যেমন ৩ মাস বা ১ বছর) বিদেশ ভ্রমণের লিখিত অনুমোদন প্রদান করেন। উক্ত আদেশের সার্টিফাইড কপি ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের (SB) ইমিগ্রেশন সেকশনের রিসিভ কপি সাথে রাখলে বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশ কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি করতে পারে না এবং নাগরিক নির্বিঘ্নে তার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সম্পন্ন করতে পারেন।