লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-13
জীবনের সমস্ত উপার্জন দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছেন, বাড়ি বানিয়ে দিয়েছেন কিংবা স্নেহের বশে জমি হেবা দলিল (Gift Deed) করে দিয়েছেন; কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সেই সন্তানই পিতা-মাতাকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে বা খাবার বন্ধ করে দিয়েছে—আদালতে এটি এক হৃদয়বিদারক বাস্তব চিত্র। ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী কীভাবে অবাধ্য সন্তানকে শাস্তি দেবেন এবং বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করবেন, তা নিয়ে আইনি পর্যালোচনা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ (Maintenance of Parents Act, 2013) অনুযায়ী—প্রত্যেক সন্তান তার পিতা-মাতার নিয়মিত ভরণপোষণ, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং তাদের সাথে একই গৃহে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে আইনত বাধ্য। সন্তান যদি একাধিক হয়, তবে সবাই মিলে বা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী পিতা-মাতার ব্যয়ভার বহন করবে। কোনো সন্তান যদি নিজে সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও পিতা-মাতাকে অবহেলা করে, তবে তা সরাসরি আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আইনের ৫ ধারা অনুসারে—কোনো সন্তান যদি পিতা-মাতার ভরণপোষণ না দেয়, তবে আদালত সংশ্লিষ্ট সন্তানকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করতে পারেন। একই সাথে স্ত্রী বা শ্বশুরবাড়ির পরামর্শে কোনো সন্তান পিতা-মাতাকে অবহেলা করলে উসকানিদাতা হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও আইনের একই ধারায় অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন।
অনেক বৃদ্ধ পিতা স্নেহের বশে সন্তানের নামে সম্পূর্ণ বাড়ি বা জমি হেবা দলিল করে দেন। হেবা হওয়ার পর সন্তান যদি পিতা-মাতাকে নির্যাতন করে বের করে দেয়, তবে দেওয়ানি আদালতে চুক্তি আইন ও সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারায় মামলা করে হেবা দলিল বাতিল করানো যায়। আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে হেবা দলিলটি প্রতারণামূলকভাবে (Fraud) বা অনির্দিষ্ট প্রভাব (Undue Influence) খাটিয়ে সম্পাদন করানো হয়েছিল এবং উপহারের শর্ত অনুযায়ী সেবা ও ভরণপোষণ লঙ্ঘন করা হয়েছে।
সম্পত্তি যদি পিতা বা মাতার নিজ নামে থাকে, তবে সন্তান কেবল একজন অনুগ্রাহক বা লাইসেন্সধারী (Licensee) হিসেবে বসবাস করে। সন্তান পিতা-মাতাকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করলে পিতা-মাতা সহকারী জজ আদালতে ‘অনুপ্রবেশকারী হিসেবে উচ্ছেদ’ (Eviction of Trespasser) এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭ ধারায় শান্তিরক্ষার মুচলেকা করিয়ে সন্তানকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার আইনি আদেশ নিতে পারেন।
পিতা-মাতা সরাসরি মেট্রোপলিটন বা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দ্রুত প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা বা প্রবেশন অফিসারের মাধ্যমে পারিবারিক তদন্ত করিয়ে সন্তানকে আদালতে তলব করেন এবং নির্ধারিত মাসিক খোরপোশের আদেশ নিশ্চিত করেন।
আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী—পিতা-মাতার অবর্তমানে বা পিতা অক্ষম হলে দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণ দেওয়া উপযুক্ত নাতি-নাতনিদের জন্য আইনত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
জীবদ্দশায় নিজের সমস্ত জমি বা বাড়ি কোনো সন্তানের নামে লিখে দেবেন না। সবসময় নিজের জীবদ্দশার জন্য একটি অংশ নিজের নামে সংরক্ষণ করুন অথবা ওসিয়তনামা (Will) করে রাখুন যা আপনার মৃত্যুর পরেই কার্যকর হবে।