বাংলাদেশে পুলিশ রিমান্ড: আপনার আইনি অধিকার

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-03-09

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

পুলিশ যখন কাউকে গ্রেফতার করে রিমান্ডের আবেদন করে — ২৪ ঘণ্টার বাইরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে রাখার অনুমতি — তখন অভিযুক্ত ও তার পরিবার প্রায়ই ভয় ও অজ্ঞতায় থাকেন। বাংলাদেশে পুলিশ রিমান্ডে আইনি অধিকার জানা থাকলে আইনি প্রক্রিয়া ও অবিচারের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব।

বাংলাদেশে পুলিশ রিমান্ড কী?

পুলিশ রিমান্ড — আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ হেফাজত রিমান্ড বলা হয় — হলো যখন আদালত পুলিশকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একজন গ্রেফতার ব্যক্তিকে তাদের শারীরিক হেফাজতে রাখার অনুমতি দেয়। বাংলাদেশে প্রতিটি গ্রেফতার ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হয় — তার পরে রিমান্ড ছাড়া হেফাজতে রাখা বেআইনি।

রিমান্ড বাংলাদেশের ফৌজদারি পদ্ধতিতে সবচেয়ে অপব্যবহৃত বিধানগুলির একটি। তাই অভিযুক্ত ও তার পরিবারের আইনগত সীমা ও সুরক্ষা জানা অপরিহার্য। রিমান্ড আবেদনের মুহূর্তে একজন ফৌজদারি আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করুন।

Cr.P.C অনুযায়ী রিমান্ডের আইনি ভিত্তি

রিমান্ড ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (Cr.P.C)-এর ধারা ১৬৭ দ্বারা পরিচালিত। এই ধারা অনুযায়ী:

  • পুলিশ গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করে আরও হেফাজতের আবেদন করতে পারে।
  • ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তকালীন মোট ১৫ দিন পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতের অনুমতি দিতে পারেন।
  • ১৫ দিন পরে পুলিশ হেফাজত অনুমোদিত নয়; অভিযুক্তকে বিচারিক হেফাজতে (কারাগার) পাঠাতে হবে।
  • মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড যোগ্য অপরাধে ৬০ দিনে এবং অন্য অপরাধে ৩০ দিনে চার্জশিট না দিলে অভিযুক্ত জামিনের অধিকার পান।

সর্বোচ্চ রিমান্ড মেয়াদ

বাংলাদেশে রিমান্ডের মূল সময়সীমা:

  • ২৪ ঘণ্টা: গ্রেফতারের পর নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার বাধ্যবাধকতা।
  • ১৫ দিন: তদন্তকালে সর্বোচ্চ পুলিশ হেফাজতের মোট মেয়াদ।
  • ৩০/৬০ দিন: এর মধ্যে চার্জশিট না দিলে অভিযুক্ত জামিনের অধিকার অর্জন করেন।

ম্যাজিস্ট্রেটের রিমান্ড আদেশ ছাড়া ২৪ ঘণ্টার বেশি হেফাজতে রাখা বেআইনি। একজন আইনজীবী তাৎক্ষণিকভাবে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে পারেন।

পুলিশ হেফাজতে আপনার অধিকার

বাংলাদেশ আইন ও সংবিধান পুলিশ হেফাজতে থাকা ব্যক্তিকে কিছু মৌলিক অধিকার দেয়:

  • গ্রেফতারের কারণ জানার অধিকার (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৩)।
  • পছন্দের আইনজীবীর সাথে পরামর্শের অধিকার — বিনা বিলম্বে।
  • ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থিত করার অধিকার।
  • নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ থেকে মুক্তির অধিকার — নির্যাতন ও হেফাজতি মৃত্যু (প্রতিরোধ) আইন ২০১৩।
  • চিকিৎসা পরীক্ষার অধিকার — শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে।
  • পরিবারকে জানানোর অধিকার — গ্রেফতার ও হেফাজতের স্থান।

জোর বা নির্যাতনে দেওয়া যেকোনো বিবৃতি আইনত অগ্রহণযোগ্য। পরিবারের কেউ রিমান্ডে থাকলে অবিলম্বে একজন জামিন আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করুন।

আদালত রিমান্ড আবেদন কীভাবে বিবেচনা করে

পুলিশ রিমান্ড আবেদন করলে ম্যাজিস্ট্রেট যাচাই করেন:

  • অভিযুক্তের সাথে অভিযোগের যুক্তিসঙ্গত সংযোগ আছে কিনা।
  • তদন্তের জন্য পুলিশ হেফাজত সত্যিই প্রয়োজন কিনা।
  • বিচারিক হেফাজত (কারাগার) তদন্তের উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে কিনা।

একজন দক্ষ আইনজীবী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে রিমান্ড বিরোধী যুক্তি উপস্থাপন করে হেফাজত অস্বীকার বা কমাতে পারেন।

বেআইনি রিমান্ড চ্যালেঞ্জ করার পদ্ধতি

রিমান্ড আদেশ অনুচিতভাবে প্রদান হলে বা বৈধ আদেশ ছাড়া হেফাজত থাকলে আইনি প্রতিকার:

  • হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন — বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে দাখিল করে বেআইনি হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ও দ্রুত প্রতিকার।
  • ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দরখাস্ত — রিমান্ড আদেশ বাতিলের জন্য।
  • রিভিশন আবেদন — সেশন জজের কাছে ম্যাজিস্ট্রেটের রিমান্ড আদেশের বিরুদ্ধে।

বিলম্ব না করেই পদক্ষেপ নিন। একজন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জরুরি ভিত্তিতে হেবিয়াস কর্পাস দাখিল করতে পারেন।

রিমান্ডে আইনজীবীর ভূমিকা

পুলিশ রিমান্ড আবেদনের মুহূর্ত থেকে আইনজীবীর উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার একজন ফৌজদারি আইনজীবী:

  • রিমান্ড বিরোধী যুক্তি উপস্থাপন বা রিমান্ড সময় কমাতে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির থাকবেন।
  • রিমান্ড মুলতবি থাকাকালীন সমান্তরালভাবে জামিনের আবেদন করবেন।
  • নির্যাতনের লক্ষণ থাকলে চিকিৎসা পরীক্ষার অনুরোধ করবেন।
  • হেফাজত বেআইনি হলে হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস দাখিল করবেন।

অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম ঢাকার সকল আদালত স্তরে রিমান্ড শুনানিতে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। পরিচিত কেউ রিমান্ডে থাকলে আজই যোগাযোগ করুন।

হেফাজতি নির্যাতন থেকে সুরক্ষা

হেফাজতি নির্যাতন আইনে নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশে পরিচিত ঝুঁকি। নিজেকে বা পরিবারকে রক্ষার ব্যবহারিক পদক্ষেপ:

  • রিমান্ড আবেদনের শুনানিতে আইনজীবী নিশ্চিত করুন।
  • পুলিশ হেফাজত শুরুর আগে চিকিৎসা পরীক্ষা করুন — বেসলাইন প্রমাণ রাখতে।
  • সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম ও পদবি নথিভুক্ত করুন।
  • নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দায়ের করুন।
  • রিমান্ডে জোরে দেওয়া যেকোনো স্বীকারোক্তি বিচারে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চ্যালেঞ্জ করা যায়।