স্বামী বা স্ত্রীর পরকীয়া: দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারা ও আইনি সমাধান ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-10

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

দাম্পত্য জীবনে পরকীয়া এক মর্মান্তিক পারিবারিক বিপর্যয় ডেকে আনে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারের ফলে স্বামী বা স্ত্রীর পরকীয়ার ঘটনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যখন একজন জীবনসঙ্গী জানতে পারেন যে তার অপর সঙ্গী তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সাথে পরকীয়া প্রেমে বা শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত, তখন মানসিক আঘাতের পাশাপাশি বহু আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়—যেমন: এটি কি ফৌজদারি অপরাধ? থানায় বা আদালতে মামলা করা যাবে কি না? পরকীয়ার কারণে তালাক দিলে স্ত্রীকে কি দেনমোহর ও ভরণপোষণ দিতে হবে? আর নিষ্পাপ সন্তানদের কাস্টডি বা অভিভাবকত্ব কার কাছে থাকবে? এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকায় বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৯৭ ধারা এবং পারিবারিক আইনের আলোকে পরকীয়ার আইনি সমাধান বিশ্লেষণ করা হলো।

দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারার বিধানটি ১৮৬০ সালের ভিক্টোরিয়ান আইনের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত। এ ধারা অনুযায়ী:

📖 ৪৯৭ ধারার সুনির্দিষ্ট বিধান

কোনো পুরুষ যদি জেনে শুনে অন্য কোনো পুরুষের বিবাহিত স্ত্রীর সাথে স্বামীর সম্মতি বা অনুমোদন ছাড়া যৌনসঙ্গম করে এবং তা যদি ধর্ষণ না হয়, তবে ওই পুরুষ ব্যভিচারের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবে এবং তার সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

আইনটির গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা: এ ধারায় পরকীয়ায় লিপ্ত স্ত্রী অপরাধী হিসেবে শাস্তিযোগ্য নন এবং তাকে দুষ্কর্মের সহায়তাকারী হিসেবেও দায়ী করা যায় না। আবার স্বামী যদি অন্য কোনো অবিবাহিত নারী বা বিধবার সাথে পরকীয়া করে, তবে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে ৪৯৭ ধারায় মামলা করতে পারেন না। তাই ব্যভিচার মামলার চেয়ে বর্তমানে পারিবারিক আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদ ও ক্ষতিপূরণের প্রতিকারই বেশি কার্যকর।

পারিবারিক কলহ নিরসনে সুপ্রিম কোর্টের মধ্যস্থতা কেন্দ্র (Mediation Centre) ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিরোধের শুরুতে সরাসরি আক্রমণাত্মক মামলা মোকদ্দমায় না জড়িয়ে অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা হলে সন্তানদের মানসিক আঘাত বহুলাংশে লাঘব হয়। তবে অপরাধমূলক ব্ল্যাকমেইল বা হুমকির ক্ষেত্রে অবিলম্বে সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া মুসলিম পারিবারিক আইনে পারিবারিক আদালতের বিচারক স্বয়ং আপস নিষ্পত্তির জন্য উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে থাকেন।

বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইনে দেনমোহর (Dower/Mahr) হলো স্ত্রীর একটি অবিচ্ছেদ্য শর্তহীন অধিকার। স্বামী যদি স্ত্রীর পরকীয়ার প্রমাণ পেয়ে তাকে তালাক দেন, তবুও প্রচলিত মুসলিম আইন অনুযায়ী স্বামীকে পূর্ণ দেনমোহর এবং ইদ্দতকালীন (৩ মাস) ভরণপোষণ পরিশোধ করতে হয়।

তবে স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় খোলা তালাক (Khula Divorce) বা মুবারাত পদ্ধতিতে আপসে বিবাহ বিচ্ছেদ মেনে নেন, তবে পারস্পরিক সমঝোতায় দেনমোহর মওকুফ হতে পারে। আবার স্বামী যদি স্ত্রীর বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গ বা পরকীয়ার মাধ্যমে পারিবারিক সম্মানহানির দেওয়ানি ক্ষতিপূরণের মামলা করেন, তবে তা আপসের দরকষাকষিতে বড় ভূমিকা পালন করে।

স্বামী বা স্ত্রী পরকীয়ার শিকার হলে কার কী আইনি প্রতিকার রয়েছে তা নিচে তুলনামূলকভাবে দেখানো হলো:

পরিস্থিতিস্বামীর প্রাপ্ত আইনি প্রতিকারস্ত্রীর প্রাপ্ত আইনি প্রতিকার
ফৌজদারি মামলাস্ত্রীর প্রেমিকের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারায় সিআর মামলা দায়েরমানসিক নির্যাতনের অভিযোগে নারী নির্যাতন বা পারিবারিক সহিংসতা আইনে মামলা
বিবাহ বিচ্ছেদ (তালাক)১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ ধারা অনুযায়ী তালাক নোটিশ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী আদালতে তালাকের ডিক্রি দাবি
সন্তানের কাস্টডিমায়ের অনৈতিক জীবনযাপন প্রমাণ করে পারিবারিক আদালতে হেফাজত চাওয়াবাবার অবহেলা প্রমাণ করে নাবালক সন্তানের লালন-পালনের অধিকার রাখা

আদালতে অভিযোগ করলেই চলবে না, উপযুক্ত প্রমাণ দাখিল করতে হবে। তবে প্রমাণের ক্ষেত্রে গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত অতি ব্যক্তিগত ভিডিও বা বেআইনি হ্যাকিং আদালতে বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

আদালতে গ্রহণযোগ্য ডিজিটাল সাক্ষ্য হলো:

  • মোবাইল অপারেটরের কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) যা আদালতের নির্দেশে তলব করা হয়।
  • হোটেল বা রিসোর্টের বুকিং স্লিপ, সিসিটিভি ফুটেজ ও রেজিস্টার বুক।
  • সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাট হিস্ট্রি, অডিও রেকর্ড ও ছবি।
  • প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সাক্ষ্যদান।

অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০ (Guardian and Wards Act)-এর আওতায় পারিবারিক আদালত সন্তানের কাস্টডি নির্ধারণে একমাত্র যে নীতিকে প্রাধান্য দেন তা হলো: 'সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ (Welfare of the Minor)'।

যদি প্রমাণ করা যায় যে মা বা বাবা পরকীয়ায় মত্ত হয়ে সন্তানের লেখাপড়া, মানসিক স্বাস্থ্য ও সুরক্ষাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন বা অনৈতিক পরিবেশে সন্তানকে বড় করছেন, তবে আদালত প্রচলিত বয়সের বাধ্যবাধকতা শিথিল করে অপর অভিভাবককে সন্তানের হেফাজত প্রদান করেন। উচ্চ আদালতের বহু নজিরে পরকীয়ায় লিপ্ত স্ত্রীর কাছ থেকে নাবালক সন্তানকে বাবার জিম্মায় হস্তান্তরের রায় রয়েছে।

দাম্পত্য জীবনে পরকীয়া প্রমাণিত হলে দীর্ঘমেয়াদী মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে সামাজিক মানসম্মান নষ্ট না করে অনেক দম্পতি আইনি সমঝোতার মাধ্যমে আলাদা হতে চান। মুসলিম পারিবারিক আইনে খোলা তালাক (Khula) হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে স্ত্রী স্বামীর সাথে পরকীয়া বা অন্য কোনো কারণে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে অনিচ্ছুক হলে দেনমোহরের সম্পূর্ণ বা আংশিক অংশ ছেড়ে দিয়ে স্বামীর সম্মতি সাপেক্ষে বিচ্ছেদ গ্রহণ করেন। অন্যদিকে মুবারাত (Mubarat) হলো উভয়ের পারস্পরিক সম্মতিতে সকল দেনা-পাওনা ও খোরপোশের হিসাব চুকিয়ে বিচ্ছেদ। অভিজ্ঞ আইনজীবীর উপস্থিতিতে একটি 'আপস রফাফরকতি দলিল' (Deed of Settlement) সম্পাদন করে রেজিস্ট্রি তালাক কার্যকর করলে ভবিষ্যতে উভয় পক্ষ সব ধরনের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকেন।

অনেক সময় ক্ষুব্ধ স্বামী বা স্ত্রী সঙ্গীর পরকীয়ার ভিডিও, হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশট বা অন্তরঙ্গ ছবি ফেসবুক, ইউটিউব বা আত্মীয়স্বজনের কাছে ছড়িয়ে দেন। আইন অনুযায়ী এটি মারাত্মক অপরাধ। সাইবার সুরক্ষা আইন এবং দণ্ডবিধির ৫০০ ধারায় মানহানি ও সাইবার হয়রানির দায়ে ছবি ফাঁসকারী স্বামী বা স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২ থেকে ৫ বছরের জেল ও জরিমানা হতে পারে। পারিবারিক আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা এবং জনসম্মুখে প্রকাশ করার মধ্যে বিশাল আইনি পার্থক্য রয়েছে। যেকোনো ডিজিটাল সাক্ষ্য কেবল সিলগালা খামে বিজ্ঞ আদালতের এজলাসে জমা দিতে হবে, কখনো সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা যাবে না।

অনেক ক্ষেত্রে পরকীয়ায় বিভ্রান্ত হয়ে জীবনসঙ্গী হুট করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে এবং সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলে অপর পক্ষ পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ (Family Courts Ordinance)-এর আওতায় 'দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার' (Restitution of Conjugal Rights) মোকদ্দমা দায়ের করেন। এই মোকদ্দমার মূল উদ্দেশ্য হলো সংসারটি টিকিয়ে রাখা এবং তৃতীয় পক্ষের অবৈধ প্রভাবমুক্ত করে সঙ্গীকে ঘরে ফিরিয়ে আনা।

আদালত প্রথমে উভয় পক্ষকে বিচারকের খাসকামরায় ডেকে গোপন ও নিরপেক্ষ পারিবারিক সালিশ (Conciliation) পরিচালনা করেন। যদি দেখা যায় যে স্ত্রী বা স্বামী ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসতে সম্মত হন, তবে আদালত কোনো পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত না করে পারস্পরিক আপসে সংসার পরিচালনার নির্দেশ দেন। তবে স্ত্রী যদি সুনির্দিষ্ট শারীরিক বা মানসিক নিষ্ঠুরতার প্রমাণ দেন, তবে আদালত দাম্পত্য পুনরুদ্ধারের ডিক্রি বাতিল করতে পারেন। এটি উভয় পক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের একটি স্বচ্ছ আইনি মঞ্চ।

দাম্পত্য জীবনে পরকীয়ার কারণে যখন পরিবারে নিত্যনৈমিত্তিক অশান্তি, গালিগালাজ, মারধর বা মানসিক নির্যাতন শুরু হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত নারী বা সন্তানরা পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এর আওতায় জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা আদেশ (Protection Order) চাইতে পারেন। এই আইনের আওতায় স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকদের শারীরিক নির্যাতন বা মানসিক নির্যাতন থেকে বিরত রাখার কড়া নির্দেশ দেন আদালত।

একই সাথে আদালত স্ত্রীকে তার যৌথ বসতবাড়িতে নিরাপদে বসবাসের অধিকার (Residence Order) এবং চিকিৎসার ক্ষতিপূরণ ও অন্তর্বর্তীকালীন ভরণপোষণ মঞ্জুর করতে পারেন। পরকীয়ার কারণে ভেঙে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের মানসিক ট্রমা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে এই আইনটি একটি অত্যন্ত দ্রুত ও কার্যকর আইনি সমাধান।

⚖️ পারিবারিক বিরোধ ও দাম্পত্য আইনি জটিলতায় বিশ্বস্ত সেবা

দাম্পত্য সংকট অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত নিলে নিজের মানহানি ও ভবিষ্যৎ সন্তানের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও পারিবারিক আদালতের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম অত্যন্ত গোপনীয়তা ও পেশাদারিত্বের সাথে পারিবারিক কাউন্সেলিং, তালাক নোটিশ, সন্তানের কাস্টডি ও আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা প্রদান করেন।

সরাসরি চেম্বার পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন:
📞 ফোন / হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৭১২৬৫৫৫৪৬ (01712655546)
📍 চেম্বার: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ভবন, ঢাকা।