লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-10
পাড়া-মহল্লা বা গ্রামে প্রতিবেশী সংক্রান্ত বিরোধ একটি নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা। অনেক সময় দেখা যায় পাশের বাড়ির প্রভাবশালী প্রতিবেশী গায়ের জোরে চলাচলের একমাত্র সাধারণ রাস্তাটি বন্ধ করে সীমানা প্রাচীর (Boundary Wall) তুলে ফেলেছে, কিংবা নিজের বাড়ির বা বাথরুমের নোংরা পানির ড্রেন অন্য কারও আঙ্গিনা বা উঠানের দিকে পাইপ লাগিয়ে ফেলে রাখছে। বারবার পারিবারিকভাবে অনুরোধ বা স্থানীয় সালিশে মীমাংসার চেষ্টা করেও কোনো কাজ হয় না, উল্টো মারমুখী আচরণ ও হুমকি প্রদর্শন করা হয়। অনেকেই ভেবে পান না যে এমন পরিস্থিতিতে কী করণীয়। বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১৩৩ ধারা এবং দেওয়ানি আদালতে ইজমেন্ট বা সুখাধিকার (Easement Rights) আইনের মাধ্যমে খুব দ্রুত এই বেআইনি উপদ্রব অপসারণ ও অবৈধ দেওয়াল উচ্ছেদ করা সম্ভব। জানুন ২০২৬ সালের হালনাগাদ আইনি সমাধান।
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর ১৩৩ ধারা হলো যেকোনো ধরনের জনসাধারণের চলাচলের পথ বা উন্মুক্ত স্থানে অন্যায় দখল ও উপদ্রব বন্ধের সবচেয়ে দ্রুত ও শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার।
কোনো ব্যক্তি যদি সাধারণের চলাচলের পথ, নদী বা ড্রেন বেআইনিভাবে বন্ধ করে দেয় অথবা বিপজ্জনক প্রাচীর বা আবর্জনা ফেলে স্বাস্থ্যহানি ঘটায়, তবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উক্ত ব্যক্তিকে কারণ দর্শানোর এবং অবিলম্বে ওই বাধা বা উপদ্রব অপসারণের নির্দেশ দেন। আদেশ অমান্য করলে দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারায় জেল ও জরিমানা এবং পুলিশ দিয়ে দেওয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
প্রতিবেশী সংক্রান্ত সীমানা বিরোধে দেওয়ানি আদালতে জমি স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ (Specific Relief Act)-এর ৮ ও ৯ ধারার যৌথ প্রয়োগ করা যায়। যদি প্রতিবেশী কোনো নোটিশ ছাড়াই জোরপূর্বক রাতের আঁধারে অন্যের সীমানায় দেওয়াল বা স্থাপনা তৈরি করে ফেলে, তবে দখলচ্যুত হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে ৯ ধারায় দ্রুত দখল উদ্ধারের মোকদ্দমা করা যায়, যাতে দীর্ঘায়িত মালিকানা প্রমাণের পূর্বেই আদালত বাদীর বাস্তব দখল ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ জারি করেন। আইনের শাসন মেনে আদালতের আদেশ জারি করানোই সবচেয়ে টেকসই প্রতিকার।
সুখাধিকার আইন, ১৮৮২ (Indian Easements Act, 1882)-এর ১৫ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি কোনো পথ বা আলো-বাতাস কোনো বাধা ছাড়া নিরবচ্ছিন্নভাবে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে (সরকারি ভূমির ক্ষেত্রে ৬০ বছর) ব্যবহার করে থাকেন, তবে তা তার আইনসম্মত অবিচ্ছেদ্য অধিকারে (Prescriptive Easement) পরিণত হয়।
জমিটি প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হলেও, যদি ওই পথ ছাড়া আপনার বাড়িতে প্রবেশের আর কোনো বিকল্প রাস্তা না থাকে (Easement of Necessity), তবে প্রতিবেশী কোনোভাবেই সেই পথ বন্ধ করতে পারেন না। জোর করে দেওয়াল তুললে আদালত তা ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।
চলাচলের সাধারণ পথ বা ড্রেনের স্বাভাবিক প্রবাহ হলো গণমানুষের যৌথ অধিকারের অংশ। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং জোরজুলুমের সংস্কৃতি বন্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়াই একমাত্র ভদ্র ও সভ্য উপায়। নির্বাহী আদালত ও দেওয়ানি আদালতের আদেশের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিবেশীর সাথে বিরোধের স্থায়ী অবসান এবং নাগরিক অধিকারের পূর্ণ সুরক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রতিবেশীর উপদ্রব নিরসনে দুটি আদালতের ভূমিকা ও সুবিধার তুলনামূলক বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
| বিবেচ্য বিষয় | নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (CrPC ১৩৩ ধারা) | দেওয়ানি জজ আদালত (ইজমেন্ট মোকদ্দমা) |
|---|---|---|
| প্রতিকারের গতি | খুব দ্রুত (কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অন্তর্বর্তী আদেশ) | দীর্ঘমেয়াদী তবে স্থায়ী ডিক্রি নিশ্চিত হয় |
| মূল লক্ষ্য | তাৎক্ষণিক শান্তি রক্ষা ও বাধা/উপদ্রব অপসারণ | চলাচলের স্থায়ী আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা ও দলিল স্বীকৃতি |
| বাস্তবায়ন পদ্ধতি | স্থানীয় থানা ও এসিল্যান্ডের উপস্থিতিতে বলপ্রয়োগ | আদালতের নাজির ও পুলিশি নির্দেশনায় ডিক্রি জারি |
যদি প্রতিবেশী আগেই জোরপূর্বক দেওয়াল বা স্থাপনা নির্মাণ করে ফেলে, তবে দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের আওতায় বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা বা ম্যান্ডেটরি ইনজাংশন (Mandatory Injunction) প্রার্থনা করতে হয়।
আদালত শুনানিতে সন্তুষ্ট হলে প্রতিবেশীকে নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে নিজ খরচে দেওয়াল ভেঙে পথ উন্মুক্ত করার নির্দেশ দেন। প্রতিবেশী তা না করলে আদালতের নিজস্ব খরচে বুলডোজার বা শ্রমিক দিয়ে দেওয়াল ভেঙে খরচের টাকা বিবাদীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদায় করা হয়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
প্রতিবেশী সংক্রান্ত বিরোধ কেবল পথ বা নুইসেন্সেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক সময় সীমানা প্রাচীর নির্মাণের নামে মারপিট, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং জমি জবরদখলের পরিবেশ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে ১৩৩ ধারার পাশাপাশি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা (শান্তি রক্ষার জন্য জরুরি আদেশ ও জমিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা) অথবা ১৪৫ ধারা (জমির বাস্তব দখল নির্ধারণ ও শান্তি বজায় রাখা)-এর আবেদন অত্যন্ত কার্যকর। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত উভয় পক্ষকে জমিতে যেতে নিষেধ করে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার জন্য থানার পুলিশকে নির্দেশনা দেন। এতে তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়াল নির্মাণ বা বলপ্রয়োগের অপচেষ্টা বন্ধ হয়ে যায় এবং আদালতের তদন্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ জমিতে শান্তিশৃঙ্খলা অটুট থাকে।
সীমানা প্রাচীর বা ড্রেন নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার আইন এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC)-এর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কোনো ব্যক্তি চাইলেই অন্যের সীমানা ঘেঁষে কোনো দেওয়াল বা স্থাপনা তৈরি করতে পারেন না; বাতাস ও আলোর জন্য ন্যূনতম নির্ধারিত দূরত্ব (Setback Distance) বজায় রাখা আইনত বাধ্যতামূলক। আপনার প্রতিবেশী যদি ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদনহীন নকশায় অবৈধ দেওয়াল তুলে ড্রেন বন্ধ করে, তবে স্থানীয় প্রকৌশল শাখা ও মেয়রের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে ভ্রাম্যমাণ আদালত (Mobile Court) পরিচালনা করে উক্ত অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে জরিমানা ধার্য করা হয়।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩৩ ধারার মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো তদন্তকারী সংস্থার নিরপেক্ষ সরেজমিন প্রতিবেদন (Local Inspection Report)। নির্বাহী আদালত সাধারণত সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) অথবা স্থানীয় থানার এসআই-কে নির্দেশ দেন সরেজমিনে গিয়ে বিরোধীয় দেওয়াল বা ড্রেনের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে।
তদন্ত কর্মকর্তা সরেজমিনে গিয়ে দেখেন যে: (১) পথটি পূর্বে সাধারণ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ছিল কিনা, (২) নতুন দেওয়ালের কারণে বাদীর বাড়িতে যাতায়াতের বিকল্প কোনো পথ আছে কিনা, এবং (৩) নোংরা পানির প্রবাহ আশপাশের জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপদ্রব তৈরি করছে কিনা। এই প্রতিবেদন যখন আদালতে দাখিল হয়, তখন বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়ালটি অবিলম্বে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বা ড্রেনটি অপসারণের চূড়ান্ত রুল (Absolute Rule) জারি করেন। পুলিশ পাহারায় স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে এই আদেশ সরাসরি বাস্তবায়ন করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী নিজের অন্যায় ঢাকতে উল্টো বাদীর বিরুদ্ধেই মিথ্যা মারপিট বা দেয়াল ভাঙার মিথ্যা মামলা সাজানোর অপচেষ্টা চালায়। এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধে দণ্ডবিধির ৪৪১ ও ৪৪৭ ধারায় 'অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশ' (Criminal Trespass) এবং ৪২৭ ধারায় অন্যায়ভাবে ক্ষতিসাধনের (Mischief) অভিযোগে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাল্টা নিয়মিত মামলা দায়ের করা অত্যন্ত কার্যকর।
একই সাথে স্থানীয় থানা পুলিশকে তাৎক্ষণিক লিখিত ডায়েরি (জিডি) দিয়ে বিরোধপূর্ণ এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি অবহিত রাখতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন তলব করে উভয় পক্ষের আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করেন। এর ফলে প্রতিপক্ষের মিথ্যা মামলার চাপ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং মূল ১৩৩ ধারার নুইসেন্স মামলায় বাদীর পক্ষে রায় নিশ্চিত করা অনেক সহজতর হয়।
প্রতিবেশীর অন্যায় উৎপাতে নিজের ভিটেমাটিতে বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়লে নীরব থাকা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া। আইনসম্মত উপায়ে সঠিক আদালতে মামলা দায়ের করে নিজের অধিকার রক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা আদালতের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম সীমানা বিরোধ, রাস্তা উদ্ধার ও নুইসেন্স মামলায় নির্ভরযোগ্য সেবা প্রদান করছেন।
সরাসরি চেম্বার পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন:
📞 ফোন / হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৭১২৬৫৫৫৪৬ (01712655546)
📍 চেম্বার: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ভবন, ঢাকা।