রিয়েল এস্টেট আইন ২০১০: ডেভেলপার কোম্পানি সময়মতো ফ্ল্যাট না দিলে বা চুক্তি ভাঙলে মামলার নিয়ম ২০২৬
লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-11 · 12 min read
⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়।
সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।
একটি স্বপ্নের ফ্ল্যাট কেনার জন্য একজন সাধারণ নাগরিক তার জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, পেনশনের টাকা কিংবা ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ডেভেলপার কোম্পানির হাতে তুলে দেন। কিন্তু বাংলাদেশের আবাসন খাতে সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হলো—চুক্তির নির্ধারিত ৩ বা ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও ডেভেলপার কোম্পানি ফ্ল্যাটের নির্মাণ কাজ শেষ করে না, চাবি হস্তান্তর করে না, কিংবা ভুয়া অজুহাতে চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত লাখ লাখ টাকা দাবি করে বসে। অনেক ক্ষেত্রে ডেভেলপাররা অনুমোদিত রাজউক নকশা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করে, ফ্ল্যাটের সাইজ ছোট করে দেয় অথবা একই ফ্ল্যাট একাধিক ক্রেতার কাছে প্রতারণামূলকভাবে বিক্রি করে পালিয়ে যায়। অসহায় ফ্ল্যাট ক্রেতা ও ভূমির মালিকদের এই ধরনের বহুমুখী প্রতারণা ও হয়রানি থেকে আইনি সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশ সরকার প্রণয়ন করেছে 'রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০' (আইন নং ২০, ২০১০)। এই আইন ক্রেতাকে বিলম্বিত সময়ের জন্য মাসিক সুদসহ ক্ষতিপূরণ আদায় এবং প্রতারক ডেভেলপারের বিরুদ্ধে সরাসরি কারাদণ্ডের মামলা করার আইনি ক্ষমতা দিয়েছে। ২০২৬ সালের আধুনিক নিয়মে ডেভেলপারদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের সম্পূর্ণ গাইড নিচে তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (CrPC) ও সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ
আগাম ও নিয়মিত জামিন
হাইকোর্ট বিভাগে আগাম জামিন (ধারা ৪৯৮ CrPC) ও ম্যাজিস্ট্রেট/দায়রা আদালতে নিয়মিত জামিন
সরকারি পোর্টাল ও যাচাই
supremecourt.gov.bd, judiciary.gov.bd, pcc.police.gov.bd ও land.gov.bd
জরুরি আইনি পরামর্শ চেম্বার
অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট) — ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬
⚡ এক নজরে
১. রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০-এর উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়নের সাথে সাথে আবাসন খাতে শত শত রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার কোম্পানি গড়ে উঠেছে। পূর্বে এই খাতে কোনো একক ও কঠোর নিয়ন্ত্রণকারী আইন না থাকায় সাধারণ ক্রেতারা দেওয়ানি চুক্তির সাধারণ ফাঁকফোকড়ে আটকে যেতেন এবং কোটি কোটি টাকা দিয়েও বছরের পর বছর ফ্ল্যাট পেতেন না।
২০১০ সালের রিয়েল এস্টেট আইনের যুগান্তকারী পরিবর্তন:
এই আইনের মাধ্যমে সরকার রিয়েল এস্টেট ব্যবসাকে একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসে। আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো:
১. ক্রেতা এবং ডেভেলপার উভয়ের চুক্তিগত অধিকার নিশ্চিত করা।
২. অনুমোদিত নকশা ও লেআউট প্ল্যান অনুযায়ী ভবন নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা।
৩. চুক্তি ভঙ্গকারী ডেভেলপারদের দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রিতার বাইরে এনে সরাসরি ফৌজদারি সাজার আওতায় নিয়ে আসা।
ফলে বর্তমানে কোনো ডেভেলপার ফ্ল্যাট ক্রেতাকে অবহেলা বা হয়রানি করলে দ্রুত বিচারিক প্রতিকার পাওয়ার পথ উন্মুক্ত রয়েছে।
২. ফ্ল্যাট বরাদ্দের পূর্বে ডেভেলপারের আইনগত বাধ্যবাধকতা: রাজউক অনুমোদন ও নিবন্ধন
আইনের ৫ ও ৬ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চাইলেই ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন দিতে বা বুকিং গ্রহণ করতে পারে না:
বাধ্যতামূলক শর্তসমূহ:
- জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ থেকে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার হিসেবে বৈধ নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে।
- রাজউক (RAJUK), সিডিএ, কেডিএ বা সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে ভবনের নকশা ও লেআউট প্ল্যান যথাযথভাবে অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে।
- অনুমোদিত নকশার রেফারেন্স নম্বর উল্লেখ না করে কোনো গণমাধ্যমে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি (ধারা ৫)।
- জমিটি সকল প্রকার দায়মুক্ত (Free from all encumbrances) এবং জমির মালিকানা নিরঙ্কুশ হতে হবে।
যদি কোনো ডেভেলপার অনুমোদনবিহীন প্রজেক্টে ফ্ল্যাট বিক্রি করে, তবে ক্রেতা আইনের ধারা ১৯ অনুযায়ী তৎক্ষণাৎ চুক্তি বাতিল করে পূর্ণ অর্থ ক্ষতিপূরণ সহ ফেরত চাইতে পারেন।
৩. ফ্ল্যাট হস্তান্তরে বিলম্ব হলে ক্রেতার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আইনি অধিকার (ধারা ১৫)
রিয়েল এস্টেট আইন ২০১০-এর ১৫ ধারা হলো ক্রেতার সবচেয়ে শক্তিশালী সুরক্ষার অস্ত্র।
আইনের স্পষ্ট বিধান:
১. হস্তান্তর সময়সীমা: চুক্তিতে যে তারিখের মধ্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করার অঙ্গীকার করা হয়েছে, ডেভেলপারকে সেই তারিখের মধ্যেই সকল সুযোগ-সুবিধাসহ (পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ বা বিকল্প ব্যবস্থা) ফ্ল্যাট প্রস্তুত করে হস্তান্তর করতে হবে।
২. ক্ষতিপূরণের হার: চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে প্রতিটি বিলম্বিত মাসের জন্য ডেভেলপারকে ক্রেতার জমাকৃত মোট অর্থের ওপর চুক্তিতে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে হবে।
৩. চুক্তিতে উল্লেখ না থাকলে সরকারি হার: চুক্তিতে যদি কোনো ক্ষতিপূরণের শর্ত কৌশলে বাদও দেওয়া হয়, তবুও আইনের ধারা ১৫(২) অনুযায়ী বাণিজ্যিক ব্যাংকের সর্বোচ্চ মেয়াদের মুনাফার হারে ক্রেতাকে মাসিক ক্ষতিপূরণ দিতে ডেভেলপার বাধ্য থাকবে।
উদাহরণস্বরূপ: ক্রেতা যদি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করে থাকেন এবং হস্তান্তর ১ বছর পিছিয়ে যায়, তবে প্রচলিত ব্যাংকিং হারে ক্রেতা লক্ষাধিক টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকারী।
৪. নকশা পরিবর্তন বা আয়তন কম দেওয়ার বিরুদ্ধে ক্রেতার অধিকার (ধারা ১৩)
ফ্ল্যাট প্রস্তুত হওয়ার পর বহু ক্রেতা দেখতে পান যে বিজ্ঞাপনে দেখানো সুন্দর ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়েছে অথবা ১,৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট মেপে দেখা যাচ্ছে বাস্তবে ১,১০০ বর্গফুটও হচ্ছে না।
আইনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ:
- ধারা ১৩ অনুযায়ী: ক্রেতার লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া ডেভেলপার অনুমোদিত নকশা বা স্পেসিফিকেশনের কোনো পরিবর্তন করতে পারবে না।
- আয়তনের গরমিল: যদি হস্তান্তরের সময় পরিমাপ করে দেখা যায় যে ফ্ল্যাটের প্রকৃত আয়তন চুক্তিতে উল্লিখিত আয়তনের চেয়ে কম হয়েছে, তবে কম হওয়া অংশের সমপরিমাণ অর্থ প্রচলিত বাজারমূল্যে সুদসহ ক্রেতাকে ফেরত দিতে হবে।
- নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার: চুক্তিতে উল্লিখিত ব্র্যান্ডের টাইলস, স্যানিটারি সামগ্রী বা ফিটিংসের পরিবর্তে নিম্নমানের সামগ্রী বসালে ডেভেলপারকে তা পরিবর্তন করতে হবে অথবা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৫. ফ্ল্যাট বাতিল করে সম্পূর্ণ টাকা ফেরত চাওয়ার নিয়ম ও সময়সীমা (ধারা ১৪)
যদি দেখা যায় ডেভেলপার কাজ ফেলে রেখেছে বা প্রজেক্ট বন্ধ করে দিয়েছে এবং ক্রেতা আর ওই প্রজেক্টে ফ্ল্যাট নিতে আগ্রহী নন, তবে তিনি চুক্তিমুক্ত হতে পারেন।
ধারা ১৪ অনুযায়ী টাকা ফেরতের নিয়ম:
১. ক্রেতা ডেভেলপারকে ৬০ দিনের লিখিত নোটিশ দিয়ে বরাদ্দ বাতিল করতে পারেন।
২. নোটিশ প্রাপ্তির দিন থেকে অনধিক ৩ মাসের মধ্যে ডেভেলপারকে ক্রেতার প্রদত্ত সকল অর্থ একসাথে পে-অর্ডার বা চেকের মাধ্যমে ফেরত দিতে হবে।
৩. নির্ধারিত ৩ মাসের মধ্যে টাকা ফেরত না দিলে, ডেভেলপারকে ব্যাংক হারের চেয়ে অতিরিক্ত হারে চক্রবৃদ্ধি সুদ প্রদান করতে হবে।
অনেক সময় দেখা যায় ভবন বাহ্যিকভাবে প্রস্তুত হলেও ফ্ল্যাটে লিফট, ব্যাকআপ জেনারেটর, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা বা বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির সরকারি মিটার সংযোগ থাকে না। ডেভেলপার ক্রেতাকে বলে—\"আপনারা উঠে যান, সংযোগগুলো পরে দেওয়া হবে\" কিন্তু উঠার পর বছরের পর বছর নাগরিক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। রিয়েল এস্টেট আইন ২০১০-এর ধারা ২২ অনুযায়ী ডেভেলপারকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সরকারি ইউটিলিটি সংস্থার সমস্ত অনুমোদন ও সংযোগ নিশ্চিত করেই গ্রাহকের নিকট ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে হবে। যদি বিকল্প হিসেবে সাব-স্টেশন বা এলপিজি পাইপলাইন দেওয়ার কথা থাকে, তবে হস্তান্তরের দিন থেকেই তা সম্পূর্ণ সচল থাকতে হবে। অন্যথায় হস্তান্তর অসম্পূর্ণ বলে গণ্য হবে এবং ক্রেতা প্রতি মাসের জন্য ক্ষতিপূরণ পেতে থাকবেন।
৬. ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ ড্রাফটিং ও প্রেরণ প্রক্রিয়া ২০২৬
আদালতে যাওয়ার পূর্বে আইনের আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি রক্ষা করা বাধ্যতামূলক।
আইনি নোটিশের কাঠামো:
- অভিজ্ঞ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবীর মাধ্যমে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে (AD সহ) ডেভেলপার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) ও চেয়ারম্যানের নামে নোটিশ পাঠাতে হবে।
- নোটিশে ফ্ল্যাট বরাদ্দের চুক্তিপত্র, পেমেন্টের রসিদসমূহ, হস্তান্তরের নির্ধারিত মেয়াদ এবং ২০১০ সালের আইনের ধারা ১৫, ১৬ ও ৩০ এর স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে।
- নোটিশে সাধারণত ১৫ বা ৩০ দিনের সময় দিয়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর অথবা চুক্তি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানাতে হবে।
এই আইনি নোটিশটি পরবর্তীতে আদালতে মামলার জন্য প্রাথমিক অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
⚖️ আইনি কেস মূল্যায়ন ও চেম্বার অ্যাপয়েন্টমেন্ট
আপনার জমি বিরোধ, বাটোয়ারা মামলা, জামিন, তালাক বা সাইবার জটিলতায় বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে সুপ্রিম কোর্ট বা উত্তরা চেম্বারে নথিপত্রসহ সরাসরি বসুন।
৭. ধারা ৩৬ অনুযায়ী সালিশি (Arbitration) প্রক্রিয়া: আনুষ্ঠানিক বিরোধ নিষ্পত্তি
রিয়েল এস্টেট আইন ২০১০-এর ৩৬ ধারা অনুযায়ী ক্রেতা ও ডেভেলপারের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশি আইন ২০০১ (Arbitration Act, 2001)-এর প্রয়োগ বাধ্যতামূলক।
সালিশির নিয়ম:
১. নোটিশ জারির পর উভয় পক্ষ একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করবে এবং উভয় প্রতিনিধি মিলে একজন নিরপেক্ষ তৃতীয় সালিশকার (Umpire) নির্বাচন করবেন।
২. সালিশি ট্রাইব্যুনাল উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে আনুষ্ঠানিক রোয়েদাদ (Arbitral Award) ঘোষণা করবেন।
৩. এই রোয়েদাদ দেওয়ানি আদালতের ডিক্রির মতো বাধ্যতামূলক। যদি ডেভেলপার সালিশি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করে বা রোয়েদাদ অমান্য করে, তবে সরাসরি আদালতে মামলা কার্যকর করা যায়।
৯. ডেভেলপার কোম্পানি দেউলিয়া বা বন্ধ হলে ক্রেতার সম্পত্তি সুরক্ষার অধিকার
যদি কোনো আবাসন নির্মাতা কোম্পানি কাজ অসম্পূর্ণ রেখে উধাও হয়ে যায় বা কোম্পানি বিলুপ্তির মুখে পড়ে, তবে ক্রেতারা একত্রিত হয়ে রিয়েল এস্টেট আইনের ধারা ২৮ এবং কোম্পানি আইনের আওতায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারেন। ক্রেতাদের নিয়ে একটি ফ্ল্যাট ওনার্স কল্যাণ সমিতি (Apartment Owners Welfare Association) গঠন করে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে ভবনের অবশিষ্টাংশের দায়িত্ব বুঝে নেওয়া যায়। একই সাথে দেউলিয়া আইনের বিধান মতে কোম্পানির পরিচালকদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা পরিচালনা করে তাদের ব্যক্তিগত স্থাবর সম্পত্তি ও ব্যাংক হিসাব আদালতের মাধ্যমে জব্দ করিয়ে পাওনা টাকা আদায় করা সম্ভব।
৮. ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের: অনধিক ৩ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা
ডেভেলপারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও ভীতিকর পদক্ষেপ হলো ফৌজদারি আদালতে মামলা করা।
আইনের ফৌজদারি ধারাসমূহ:
- ধারা ৩০: নিবন্ধন ছাড়া ডেভেলপার ব্যবসা বা বিজ্ঞাপন প্রকাশের অপরাধে ২ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা।
- ধারা ৩১: নকশা পরিবর্তনের অপরাধে ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা।
- ধারা ৩২: সময়মতো ফ্ল্যাট বা প্লট হস্তান্তর না করে প্রতারণা করার অপরাধে ২ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা।
- ধারা ৩৪: অনুমতি ছাড়া সম্পত্তি বন্ধক দেওয়ার অপরাধে ১ বছরের কারাদণ্ড।
মামলা কোথায় করবেন?
সংশ্লিষ্ট এলাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (CMM) বা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (CJM) আদালতে সরাসরি নালিশি পিটিশন মামলা (সিআর মামলা) দায়ের করতে হয়। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে ডেভেলপার কোম্পানির পরিচালকদের বিরুদ্ধে সমন ও জামিন-অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
৯. দেওয়ানি আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ১২ ধারা: ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি ও দখলের মামলা
অনেক সময় দেখা যায় ফ্ল্যাটের কাজ শেষ হয়েছে কিন্তু ডেভেলপার অতিরিক্ত টাকা দাবি করে ফ্ল্যাট সাব-কবলা রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছে না।
দেওয়ানি প্রতিকার:
- সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ধারা ১২ অনুযায়ী 'চুক্তি বলবতের মোকদ্দমা' (Suit for Specific Performance of Contract) দায়ের করতে হবে।
- আদালত শুনানি শেষে ডেভেলপারকে সাব-কবলা দলিল রেজিস্ট্রির নির্দেশ দেবেন। ডেভেলপার রেজিস্ট্রি করতে অস্বীকার করলে আদালত স্বয়ং সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে প্রতিনিধি পাঠিয়ে আদালতের মাধ্যমে দলিল রেজিস্ট্রি এবং পুলিশি সহায়তায় ফ্ল্যাটের চাবি ও দখল হস্তান্তর করিয়ে দেবেন।
১০. জমির মালিক (Landowner)-এর অধিকার: জমি নিয়ে কাজ ফেলে রাখলে করণীয়
ক্রেতাদের পাশাপাশি ভূমির মালিকরাও প্রায়শই ডেভেলপারদের প্রতারণার শিকার হন। জমি নিয়ে ডেভেলপার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখে কিন্তু ৫ বছরেও পাইলিং শুরু করে না।
জমির মালিকের সুরক্ষায় আইনের ২৭ ও ২৮ ধারা:
- চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরু না করলে জমির মালিক ডেভেলপারকে নোটিশ দিয়ে ডেভেলপমেন্ট চুক্তি বাতিল করতে পারেন।
- প্রদত্ত অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (Irrevocable Power of Attorney) বাতিল করার জন্য বিজ্ঞ দেওয়ানি আদালতে মামলা করে জমি ফেরত নিতে পারেন।
- জমির মালিকের ক্ষতির জন্য ডেভেলপারকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
১১. রিয়েল এস্টেট বিরোধ নিষ্পত্তিতে অ্যাডভোকেট এম ডি শাহ আলমের চেম্বারের আইনি সহায়তা
রিয়েল এস্টেট মামলাগুলোর ক্ষেত্রে দেওয়ানি চুক্তি আইন এবং ২০১০ সালের বিশেষ ফৌজদারি আইনের নিপুণ সমন্বয় প্রয়োজন হয়। সঠিক ধারায় চাপ সৃষ্টি করতে পারলে ডেভেলপাররা আপসে ফ্ল্যাট ও ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে বাধ্য হয়।
অ্যাডভোকেট এম ডি শাহ আলম সাহেবের চেম্বারের পেশাদার সেবা:
- ফ্ল্যাট ক্রয়ের পূর্বে ডেভেলপার কোম্পানির চুক্তিপত্র, রাজউক প্ল্যান ও খতিয়ানের লিগ্যাল স্ক্রুটিনি অডিট।
- ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য তাৎক্ষণিক উচ্চমানের লিগ্যাল নোটিশ ড্রাফটিং ও সালিশি প্রতিনিধিত্ব।
- সিএমএম কোর্টে ডেভেলপারের বিরুদ্ধে দ্রুত ফৌজদারি মামলা পরিচালনা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা নিশ্চিত করা।
- দেওয়ানি আদালতে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির চুক্তি বলবৎ মোকদ্দমা ও অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আদায়।
- চেম্বার যোগাযোগের ঠিকানা: রুম নং ২০৮ ও ২১৪, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবন, পুরাতন কোর্ট চত্বর, ঢাকা। ফোন: ০১৭১১-৯৪৬১৯৮ / ০১৭৩১৮৪১৯১৯।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)
ডেভেলপার ফ্ল্যাট দিতে দেরি করলে কি প্রতি মাসে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, রিয়েল এস্টেট আইন ২০১০-এর ১৫ ধারা অনুযায়ী হস্তান্তরের নির্ধারিত তারিখের পর থেকে ক্রেতার প্রদত্ত মোট টাকার ওপর মাসিক ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে ডেভেলপার আইনত বাধ্য।
ডেভেলপার অতিরিক্ত টাকা দাবি করলে কি তা দিতে হবে?
না। চুক্তিতে নির্ধারিত মূল্য ব্যতীত ক্রেতার সম্মতি ছাড়া কোনো অতিরিক্ত মূল্য বা অন্যায় চার্জ দাবি করা আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বেআইনি।
ফ্ল্যাট হস্তান্তরে ব্যর্থ হলে ডেভেলপারের বিরুদ্ধে কোন আদালতে মামলা করতে হয়?
ক্ষতিপূরণ ও সাজার জন্য চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (CMM) আদালতে ফৌজদারি মামলা এবং দলিল রেজিস্ট্রি ও দখলের জন্য উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হয়।
ডেভেলপারের বিরুদ্ধে মামলা করলে কি তার জেল হতে পারে?
হ্যাঁ, ২০১০ সালের আইনের ৩১ ও ৩২ ধারা অনুযায়ী শর্ত লঙ্ঘনকারী ডেভেলপারের সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।
অননুমোদিত নকশায় তৈরি ফ্ল্যাট বিক্রি করলে কী শাস্তি?
রাজউকের অনুমোদনহীন নকশায় ফ্ল্যাট বিক্রি করলে আইনের ধারা ৫ ও ৩০ অনুযায়ী ২ বছরের জেল এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
দায়বর্জন (Disclaimer): এই আর্টিকেলে পরিবেশিত তথ্যসমূহ কেবল আইনি সচেতনতা ও সাধারণ শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো প্রত্যক্ষ আইনি পরামর্শ (Legal Advice) নয় এবং এর মাধ্যমে কোনো আইনজীবী-মক্কেল সম্পর্ক (Attorney-Client Relationship) তৈরি হয় না। আপনার সুনির্দিষ্ট মামলার আইনি প্রতিকারের জন্য সরাসরি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বা জজ কোর্টের তালিকাভুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।
আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546 |
WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০