লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>জমিজমার ক্ষেত্রে খতিয়ান বা রেকর্ড অব রাইটস (Record of Rights - ROR) হলো মালিকানার সবচেয়ে জীবন্ত ও শক্তিশালী দলিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে জরিপ চলাকালীন সার্ভেয়ারদের অসততা, স্থানীয় দালালের কারসাজি কিংবা রেকর্ডিং কর্মীদের চরম অবহেলার কারণে আমাদের দেশে হাজার হাজার বৈধ মালিকের জমি অন্যের নামে বিএস (BS) বা আরএস (RS) খতিয়ানে রেকর্ড হয়ে যায়। বাবার কেনা জমি হঠাৎ দেখা যায় প্রতিবেশীর নামে রেকর্ড হয়ে গেছে, কিংবা নিজের নামের বানানে এমন বিকৃতি এসেছে যে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নামজারি করতে গেলে ফাইল বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। জমির মালিকের মনে তখন চরম আতঙ্ক ভর করে—<em>"খতিয়ানে নাম ভুল আসলে কীভাবে সংশোধন করব? আমি কি এসি ল্যান্ড অফিসে আবেদন করব, নাকি দেওয়ানি আদালতে মামলা করব? এবং ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল বিলুপ্ত হওয়ার পর এখন কোন আদালতে যেতে হবে?"</em> রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ (SAT Act)-এর সংশোধিত বিধান অনুযায়ী এসি ল্যান্ডের মাধ্যমে রেকর্ড সংশোধন এবং দেওয়ানি আদালতে স্বত্ব ঘোষণা ও রেকর্ড সংশোধনের সম্পূর্ণ নির্ভুল আইনি রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
খতিয়ান হলো সরকারের ভূমি জরিপ বিভাগ কর্তৃক সরেজমিনে তদন্তপূর্বক প্রস্তুতকৃত একটি সরকারি মালিকানা তালিকা। এতে জমির মালিকের নাম, পিতার নাম, ঠিকানা, হিস্যা বা অংশ, দাগ নম্বর, জমির শ্রেণি এবং রাজস্বের পরিমাণ লিপিবদ্ধ থাকে।
জরিপ কর্মীদের গাফিলতি বা প্রতিপক্ষের যোগসাজশে সাধারণত দুই ধরনের মারাত্মক ভুল হয়:
জরিপ চলাকালীন ভুল ধরা পড়লে সবচেয়ে সহজে সংশোধন করা যায়। ভূমি জরিপ চলাকালে তসদিক (Attestation) শেষে যখন খসড়া খতিয়ান প্রকাশিত হয়, তখন প্রজাস্বত্ব বিধিমালার ৩০ ধারা অনুযায়ী তসদিক অফিসারের নিকট আপত্তি (Objection) দাখিল করা যায়। ৩০ ধারার আদেশে ক্ষুব্ধ হলে ৩১ ধারা অনুযায়ী সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারের কাছে আপিল করা যায়। এই ধাপে সংশোধন করা গেলে পরবর্তীতে আর কোনো আদালতের ঝামেলা থাকে না। কিন্তু গেজেট প্রকাশিত হয়ে গেলে তখন আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়।
গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত বিএস বা আরএস খতিয়ানে যদি কেবল মুদ্রণজনিত, করণিক বা গাণিতিক ভুল থাকে, তবে স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট ১৯৫০-এর ১৪৪খ ধারা অনুযায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) তথা এসি ল্যান্ডের নিকট মিস কেস (Misc Case) দায়ের করতে হয়।
এসি ল্যান্ড পূর্ববর্তী সিএস ও আরএস রেকর্ড, মূল সাফ-কবলা দলিল এবং ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন দেখে আদেশের মাধ্যমে খতিয়ানের করণিক ভুল সংশোধন করে শুদ্ধ খতিয়ান ইস্যু করার নির্দেশ দেন।
অনেকেই এই মারাত্মক ভুলটি করেন। অন্যের নামে রেকর্ড হওয়া জমি সংশোধনের জন্য এসি ল্যান্ড অফিসে বছরের পর বছর ঘুরে সময় নষ্ট করেন।
আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেখানে স্বত্ব (Title) বা জমির মূল মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে এবং এক পক্ষের জমি সম্পূর্ণ অন্য পক্ষের নামে রেকর্ড হয়ে গেছে, সেখানে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-র কোনো ক্ষমতা নেই পূর্বে প্রকাশিত সরকারি খতিয়ান বাতিল করার। এসি ল্যান্ড কেবল করণিক ভুল ঠিক করতে পারেন। মূল মালিকানা নির্ধারণের একক আইনগত এখতিয়ার কেবল দেশের উপযুক্ত সিভিল কোর্ট বা দেওয়ানি আদালতের হাতে ন্যস্ত।
অতীতে খতিয়ান সংশোধনের জন্য প্রতিটি জেলায় ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল (LST) ছিল। কিন্তু বিচারক সংকট এবং আপিল ট্রাইব্যুনাল না থাকার কারণে লক্ষ লক্ষ মামলা বছরের পর বছর অচল হয়ে পড়েছিল।
এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশ সরকার State Acquisition and Tenancy (Amendment) Act, 2023 প্রণয়ন করে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের সমস্ত মামলা ও এখতিয়ার সরাসরি স্থানীয় সিনিয়র সহকারী জজ ও যুগ্ম জেলা জজ আদালতকে অর্পণ করেছে। এর ফলে এখন সাধারণ মানুষ নিজ উপজেলা ও জেলার নিয়মিত দেওয়ানি আদালতেই খতিয়ান সংশোধনের দ্রুত ও কার্যকর বিচার পাচ্ছেন।
যদি আপনার জমি অন্যের নামে রেকর্ড হয়ে থাকে, তবে বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালতে একটি দেওয়ানি স্বত্ব মামলা দায়ের করতে হয়।
মামলা দায়েরের নিয়মাবলী:
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা অনুযায়ী দেওয়ানি আদালত যখন সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মূল দলিলের ভিত্তিতে বাদীর অনুকূলে স্বত্বের ডিক্রি প্রদান করেন, তখন সেই ডিক্রি সমস্ত সরকারি রেকর্ডের ওপর প্রাধান্য পায়। আদালতের আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে যে বিবাদীর নামে প্রস্তুতকৃত খতিয়ানটি বেআইনি ও বাতিল এবং উক্ত খতিয়ানে বাদীর নাম প্রতিস্থাপন করার জন্য সরকারকে নির্দেশ প্রদান করা হলো।
খতিয়ান সংশোধনের মামলায় জয়ী হতে হলে আপনাকে দলিলের অকাট্য চেইন (Chain of Title) প্রমাণ করতে হবে:
দেওয়ানি আদালত থেকে ডিক্রি পাওয়ার পর বাদীর আইনজীবী ডিক্রির একটি সার্টিফাইড কপি উত্তোলন করবেন। এরপর ডিক্রি ও আদেশের কপি সহ সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে লিখিত দরখাস্ত দাখিল করতে হবে। এসি ল্যান্ড আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সরকারি ভলিউমে পূর্বের ভুল রেকর্ডটি কেটে বাদীর নামে একটি নতুন ও ত্রুটিমুক্ত সংশোধিত খতিয়ান সৃজন করে দেবেন।
খতিয়ান বনাম স্বত্ব সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের প্রতিষ্ঠিত নীতিসমূহ:
১. সিরাজুল ইসলাম বনাম আব্দুল বারেক (45 DLR): সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার রায় দেন যে, খতিয়ান বা রেকর্ড অব রাইটস কোনো স্বত্ব তৈরি করে না (Record does not create title); এটি কেবল দখলের একটি প্রাথমিক প্রমাণ। যদি দলিলের মাধ্যমে স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে ভুল খতিয়ান টিকবে না।
২. মফিজউদ্দিন বনাম জেলা প্রশাসক (50 DLR AD): আপিল বিভাগ রায় দেন যে, জরিপকর্মীর ভুলের কারণে প্রকৃত মালিকের স্বত্ব কখনো নষ্ট হয় না; দেওয়ানি আদালত সেই রেকর্ড সংশোধন করে প্রকৃত মালিককে স্বীকৃতি দিতে আইনত বাধ্য।
আদালতে যাওয়ার আগে আপনার ফাইলের প্রস্তুতি সম্পন্ন করুন:
খতিয়ানে অন্যের নাম উঠে আসলে কালক্ষেপণ করা চরম বোকামি। কারণ যার নামে রেকর্ড হয়েছে সে যেকোনো মুহূর্তে তৃতীয় কোনো ক্রেতার কাছে জমি বিক্রি করে দিতে পারে, যা মামলাকে আরও জটিল করে তুলবে। ভুল জানার সাথে সাথেই একজন অভিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত আদালতে স্বত্ব ঘোষণা ও রেকর্ড সংশোধনের মোকদ্দমা দায়ের করুন। আপনার দলিল ও দখল সঠিক থাকলে আদালত আপনার অনুকূলেই রায় দেবেন এবং আপনার জমির রেকর্ড চিরতরে নিষ্কণ্টক হবে।
অনেক ক্ষেত্রে জরিপকালে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি ভুলবশত বাংলাদেশ সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানে অথবা অর্পিত সম্পত্তি (Vested Property) হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়ে যায়। এমনটি হলে সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে পড়েন যে সরকার হয়তো তাদের জমি দখল করে নেবে। আইনগত সত্য হলো: সরকারের নামে ভুল রেকর্ড হলেও মূল মালিকের স্বত্ব নষ্ট হয় না। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন ২০০১ (সংশোধিত ২০১৩)-এর আওতায় অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালে (যুগ্ম জেলা জজ আদালত) আবেদন করে সরকারি গেজেট ও তালিকা থেকে জমি অবমুক্ত করা যায়। একইভাবে ১ নম্বর খাস খতিয়ানের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে জেলা প্রশাসককে বিবাদী করে স্বত্ব ঘোষণার দেওয়ানি মোকদ্দমা দায়ের করা যায়। সিএস থেকে শুরু করে আরএস পর্যন্ত সমস্ত খাজনা দাখিলা ও দলিলের চেইন আদালতে প্রমাণ করলে সরকার পক্ষকে বাদীর অনুকূলে জমি অবমুক্ত করে নতুন খতিয়ান সংশোধনের নির্দেশ প্রদান করা হয়।