সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইন বাংলাদেশ ২০২৬ — কে কতটুকু পাবে?

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-12

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তি কে কতটুকু পাবে — এই প্রশ্নটি বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ পরিবারের মধ্যে বিরোধের কারণ হয়। বাংলাদেশে মুসলিমদের সম্পত্তি বন্টন মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী হয়, যা পবিত্র কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনার উপর ভিত্তি করে প্রণীত। এই বিস্তারিত গাইডে আপনি জানবেন ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী, মা ও অন্য আত্মীয়রা বাবার সম্পত্তির কতটুকু পান এবং বিরোধ হলে কী করবেন।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের ভিত্তি

বাংলাদেশে মুসলিমদের উত্তরাধিকার Muslim Personal Law (Shariat) Application Act 1937 এবং পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়। এটি সুন্নি হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে।

একজন মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি বণ্টনের আগে নিচের বিষয়গুলো সম্পন্ন করতে হবে:

  1. দাফন ও কাফন খরচ: মৃতের সম্পত্তি থেকে দাফন ও কাফনের খরচ আগে নেওয়া হয়।
  2. ঋণ পরিশোধ: মৃতের সব ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
  3. উইল বাস্তবায়ন: মৃত ব্যক্তি যদি উইল করে থাকেন, তাহলে অ-ওয়ারিশকে সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত দেওয়া যাবে।
  4. অবশিষ্ট বণ্টন: উপরের সব পর সম্পত্তির অবশিষ্ট অংশ কুরআনিক নিয়মে ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন।

মুসলিম আইনে ওয়ারিশরা দুই শ্রেণীর: কোরানিক উত্তরাধিকারী (Sharers) এবং অবশিষ্ট গ্রহণকারী (Residuaries)।

বাবার সম্পত্তিতে ছেলের অংশ

বাংলাদেশের মুসলিম আইনে ছেলে বাবার সম্পত্তিতে মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পান (কুরআন সূরা নিসা ৪:১১)।

হিসাবের উদাহরণ:

  • বাবার আছে: ১টি স্ত্রী + ২ ছেলে + ২ মেয়ে।
  • স্ত্রী পাবেন: ১/৮ ভাগ (সন্তান থাকায়)।
  • বাকি ৭/৮ ভাগ: ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বণ্টন (প্রতি ছেলে = ২ ভাগ, প্রতি মেয়ে = ১ ভাগ)।
  • মোট ভাগ = ২+২+১+১ = ৬ ভাগ।
  • প্রতি ছেলে পাবেন: (৭/৮) × (২/৬) = ৭/২৪ ভাগ।
  • প্রতি মেয়ে পাবেন: (৭/৮) × (১/৬) = ৭/৪৮ ভাগ।

যদি শুধু ছেলে থাকে (কোনো মেয়ে না থাকলে), ছেলেরা অবশিষ্ট সব সম্পত্তি সমানভাবে পাবেন।

নাতির অধিকার: যদি বাবার মৃত্যুর আগে ছেলে মারা যায়, সেই মৃত ছেলের সন্তানরা (নাতি-নাতনি) দাদার সম্পত্তি পাবে না — এটি মুসলিম আইনের একটি বিতর্কিত দিক।

বাবার সম্পত্তিতে মেয়ের অংশ

মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে মেয়ে ছেলের অর্ধেক পান, তবে মেয়ে সবসময়ই সম্পত্তিতে অংশীদার:

  • একমাত্র মেয়ে (কোনো ছেলে নেই): মেয়ে পাবেন ১/২ ভাগ। বাকি অংশ অন্য কোরানিক উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে।
  • দুই বা ততোধিক মেয়ে (কোনো ছেলে নেই): একসাথে ২/৩ ভাগ পাবেন, সমানভাবে ভাগ হবে।
  • ছেলে ও মেয়ে উভয় থাকলে: ছেলে ২ ভাগ, মেয়ে ১ ভাগ হারে পাবেন।

বাংলাদেশে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারিকভাবে দেওয়া হয় না, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। মেয়ে যদি তার প্রাপ্য সম্পত্তি না পান, তিনি পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন।

মেয়ের অধিকার আদায়ে একজন ভূমি আইনজীবীর সাহায্য নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

বাবার সম্পত্তিতে স্ত্রীর অংশ

স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী (বা একাধিক স্ত্রী) সম্পত্তিতে অংশ পান:

  • সন্তান থাকলে: স্ত্রী পাবেন মোট সম্পত্তির ১/৮ ভাগ।
  • সন্তান না থাকলে: স্ত্রী পাবেন মোট সম্পত্তির ১/৪ ভাগ।
  • একাধিক স্ত্রী থাকলে: উপরোক্ত ১/৮ বা ১/৪ অংশ তাদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।

স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি (যৌতুক, মোহরানা, উপহার) আলাদা — এগুলো তার নিজের এবং স্বামীর উত্তরাধিকারে যাবে না।

বিধবা স্ত্রী যদি পুনরায় বিবাহ করেন, তবুও তিনি প্রথম স্বামীর সম্পত্তির অংশ হারাবেন না, কারণ সম্পত্তি মৃত্যুর সময়েই নির্ধারিত হয়।

মায়ের সম্পত্তিতে কে কতটুকু পাবে

মায়ের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তিতেও একই মুসলিম উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য। মায়ের সম্পত্তিতে যারা অংশ পাবেন:

  • স্বামী (বাবা): সন্তান থাকলে ১/৪ ভাগ, সন্তান না থাকলে ১/২ ভাগ।
  • ছেলে: মেয়ের দ্বিগুণ অংশ।
  • মেয়ে: ছেলের অর্ধেক অংশ।
  • মায়ের মা (নানি): সন্তান থাকলে ১/৬ ভাগ।
  • মায়ের বাবা (নানা): কিছু পরিস্থিতিতে অংশ পাবেন।

মায়ের নিজস্ব সম্পত্তি বলতে তার নিজের উপার্জন, উত্তরাধিকারে পাওয়া সম্পত্তি, মোহরানা ও উপহার অন্তর্ভুক্ত। স্বামীর সম্পত্তি মায়ের সম্পত্তি নয়।

উত্তরাধিকার সনদ কী ও কীভাবে পাবেন

উত্তরাধিকার সনদ বা Succession Certificate হলো আদালত কর্তৃক জারি করা একটি দলিল যা প্রমাণ করে কে কে মৃত ব্যক্তির আইনি উত্তরাধিকারী। এটি ব্যাংক থেকে টাকা তোলা, সরকারি সুবিধা, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য সম্পত্তি দাবি করতে লাগে।

উত্তরাধিকার সনদ পাওয়ার পদ্ধতি:

  1. ওয়ারিশান সনদ: প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে ওয়ারিশান সনদ সংগ্রহ করুন।
  2. আদালতে আবেদন: সিনিয়র সহকারী জজ বা সহকারী জজ আদালতে Succession Certificate-এর জন্য আবেদন করুন।
  3. প্রয়োজনীয় কাগজ: মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশান সনদ, মৃতের জাতীয় পরিচয়পত্র, সম্পত্তির বিবরণ, আবেদনকারীর পরিচয়পত্র।
  4. নোটিশ: আদালত বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টদের আপত্তি জানাতে ডাকে।
  5. সনদ প্রদান: আপত্তি না থাকলে আদালত সনদ জারি করে।

উত্তরাধিকার সনদ পেতে সাধারণত ২-৬ মাস লাগে। একজন আইনজীবীর সাহায্যে দ্রুততর করা সম্ভব।

সম্পত্তি বিরোধ হলে কী করবেন

পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ অত্যন্ত সাধারণ। নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:

  • আলোচনায় সমাধান: পরিবারের মুরব্বি বা মধ্যস্থতাকারীর সাহায্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন।
  • নোটিশ পাঠান: দাবি মানা না হলে আইনি নোটিশ পাঠান।
  • মধ্যস্থতা (Mediation): আদালতের বাইরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান সম্ভব।
  • পারিবারিক আদালত: যদি কোনো সমাধান না হয়, পারিবারিক আদালতে সম্পত্তি বণ্টনের মামলা দায়ের করুন।
  • দেওয়ানি আদালত: জটিল সম্পত্তি মামলা দেওয়ানি আদালতে বিচার হয়।

সম্পত্তি বিরোধে একা পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন। একজন অভিজ্ঞ ভূমি ও পারিবারিক আইনজীবী আপনার অধিকার রক্ষা করতে সবচেয়ে কার্যকরভাবে সাহায্য করতে পারেন।

মনে রাখবেন: সম্পত্তি দাবির মামলায় সীমাবদ্ধতার সময়সীমা (Limitation Period) আছে। দেরি করলে মামলা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।