শরিকি জমিতে জোরপূর্বক ভবন নির্মাণ: দেওয়ানি আদালতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইনজাংশন (নিষেধাজ্ঞা) জারির কৌশল

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-13

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

পৈতৃক সম্পত্তি আইনানুগভাবে ভাগ-বাটোয়ারা হওয়ার আগেই এক শরিক যদি গায়ের জোরে রাস্তার পাশের ভালো অংশ দখল করে বহুতল ভবন তোলা শুরু করে, তবে বাকি শরিকরা স্থায়ীভাবে বঞ্চিত হন। পুলিশে দৌড়াদৌড়ি না করে কীভাবে দেওয়ানি আদালত থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জরুরি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়ে কাজ বন্ধ করবেন, তার বাস্তব দিকনির্দেশনা দিয়েছেন <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।

যৌথ সম্পত্তির আইনগত অবস্থান: প্রতিটি ইঞ্চিতে সবার সমান হক

আমাদের দেশের প্রচলিত সম্পত্তি আইন ও মুসলিম ফরায়েজ নীতি অনুযায়ী—পিতা বা মাতার মৃত্যুর পর যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পত্তি আইনানুগভাবে রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা দলিল কিংবা আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে সীমানা ভাগ না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ওই জমির প্রতি ইঞ্চিতে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর যৌথ ও অবিভাজ্য স্বত্ব বজায় থাকে। কোনো এক শরিক একা কোনো নির্দিষ্ট কোণ বা অংশ নিজের বলে দাবি করে সেখানে একতরফাভাবে ঘরবাড়ি বা সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করতে পারেন না।

থানায় গিয়ে সময় নষ্ট: ১৪৪ ধারার ফাঁদ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা

এমন অবস্থায় বেশিরভাগ শরিক থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে বলে—‘আপাতত কাজ বন্ধ রাখুন’। কিন্তু পুলিশ চলে যাওয়ার পরেই রাতের বেলা আবার কাজ শুরু হয়। পুলিশ কোনো বিচারিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা রাখে না। আর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ১৪৪ ধারার আদেশ সর্বোচ্চ ৬০ দিন বলবৎ থাকে এবং শেষমেশ দেওয়ানি আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে নিষ্পত্তি হয়। তাই প্রথম দিন থেকেই দেওয়ানি আদালতের আশ্রয় নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মোকদ্দমা (Partition Suit) দায়ের

অবিসংবাদিত সমাধান পেতে হলে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজ বা যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বণ্টন মোকদ্দমা (Partition Suit) দায়ের করতে হবে। মামলায় সকল শরিককে বিবাদী করতে হবে এবং সিএস, এসএ, আরএস খতিয়ানের ধারাবাহিকতা ও উত্তরাধিকার সনদ (Warish Sanad) সংযুক্ত করতে হবে।

অর্ডার ৩৯ রুল ১ ও ২: ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার কৌশল

বণ্টন মামলার মূল আর্জির সাথে সাথেই দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮ (Code of Civil Procedure)-এর অর্ডার ৩৯ রুল ১ ও ২ এবং ১৫১ ধারা অনুযায়ী একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction) এবং একতরফা স্থিতাবস্থা (Ad-interim Injunction / Status Quo) চেয়ে আবেদন করতে হবে। আইনজীবী আদালতে জরুরি শুনানির ব্যবস্থা করে তুলে ধরবেন যে—এখনই নির্মাণ বন্ধ না করলে জমির আকৃতি নষ্ট হয়ে যাবে এবং অপূরণীয় ক্ষতি হবে। বিজ্ঞ আদালত সন্তুষ্ট হলে তৎক্ষণাৎ স্থিতাবস্থার আদেশ মঞ্জুর করেন।

আদালত নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে যে ৩টি মূল উপাদান পরীক্ষা করেন

বিজ্ঞ বিচারক আদেশের পূর্বে ৩টি সোনালী নিয়ম (Golden Rules) যাচাই করেন:

  • ১. আপাতদৃষ্টিতে মামলার সত্যতা (Prima Facie Case): বাদীর ওই সম্পত্তিতে বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বত্ব আছে কি না।
  • ২. অপূরণীয় ক্ষতি (Irreparable Loss): বহুতল ভবন উঠে গেলে পরবর্তীতে যা আর ভেঙে ফেলা কঠিন হবে।
  • ৩. সুবিধার ভারসাম্য (Balance of Convenience): কাজটি বন্ধ রাখলে কারও অপূরণীয় ক্ষতি হবে না, কিন্তু চালিয়ে গেলে অন্য শরিকদের অধিকার ধ্বংস হবে।

নিষেধাজ্ঞা আদেশ পাওয়ার পর পুলিশ দিয়ে কাজ বন্ধ করানোর নিয়ম

আদালত নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেওয়ার সাথে সাথে সেই আদেশের সার্টিফায়েড কপি স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) বরাবর দাখিল করে পুলিশি সহায়তার (Police Aid) প্রার্থনা করতে হবে। আদালতের নির্দেশ থাকায় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাৎক্ষণিক কাজ বন্ধ করে দিতে আইনত বাধ্য থাকবে।

আদালত অবমাননা (Contempt of Court) ও শাস্তির বিধান

আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারির পরও যদি কোনো শরিক বা তার লোকজন গায়ের জোরে নির্মাণ অব্যাহত রাখে, তবে দেওয়ানি কার্যবিধির অর্ডার ৩৯ রুল ২(৩) অনুযায়ী আদালত অবমাননার দরখাস্ত করতে হবে। আদালত দোষী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৬ মাসের দেওয়ানি কারাদণ্ড (Civil Prison) এবং তার সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দিতে পারেন।