লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>আদালতে বছরের পর বছর মামলা লড়ে উভয় পক্ষেরই বিপুল অর্থ, মূল্যবান সময় এবং শারীরিক-মানসিক শান্তি বিনষ্ট হয়। বিশেষ করে জমিজমার দেওয়ানি মোকদ্দমা এবং পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গড়ায়। এই দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্তির সবচেয়ে কার্যকর, সম্মানজনক ও নিরাপদ আইনি উপায় হলো "সোলেনামা" বা আপস নিষ্পত্তি (Compromise/Settlement)। দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর আদেশ ২৩ নিয়ম ৩ অনুযায়ী মামলার যেকোনো পর্যায়ে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষ পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে আপস নিষ্পত্তির মাধ্যমে মোকদ্দমা চূড়ান্তভাবে শেষ করতে পারেন। তবে সোলেনামায় কী কী শর্ত অন্তর্ভুক্ত করতে হয়, কীভাবে আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে স্বীকারোক্তি দিতে হয় এবং কোনো পক্ষ প্রতারণা করে সোলেনামা সম্পাদন করলে তা কীভাবে বাতিল করা যায়—তা সাধারণ মানুষের জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো। পরামর্শে: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
"সোলে" শব্দটি আরবি "সুলহ" (Sulh) থেকে এসেছে, যার আভিধানিক অর্থ হলো আপস, সমঝোতা বা পুনর্মিলন। আর "নামা" ফারসি শব্দ যার অর্থ পত্র বা লিখিত দলিল। সুতরাং সহজ কথায়, সোলেনামা হলো আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলার বিবদমান পক্ষসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পাদিত লিখিত আপস চুক্তিপত্র।
আদালতের একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে—"A bad compromise is better than a good trial." অর্থাৎ বছরের পর বছর আদালতে মামলা চালিয়ে জয়ী হওয়ার চেয়ে কিছুটা ছাড় দিয়ে একটি সম্মানজনক আপস নিষ্পত্তি অনেক বেশি লাভজনক। দেওয়ানি মামলায় একটি চূড়ান্ত রায় আসতে ১০ থেকে ২০ বছর সময় লেগে যেতে পারে। এই দীর্ঘ সময়ে উভয় পক্ষের লাখ লাখ টাকা কোর্ট ফি, আইনজীবীর ফি ও যাতায়াতে খরচ হয়। সোলেনামার মাধ্যমে পক্ষগণ কোনো তিক্ততা ছাড়াই মামলা শেষ করে নিজেদের সম্পত্তি ও অধিকার চিরতরে সুরক্ষিত করতে পারেন।
সোলেনামার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে কোনো পক্ষের হার বা জয়ের গ্লানি থাকে না। উভয় পক্ষ নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে একটি মাঝামাঝি সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এর ফলে পারিবারিক ও সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ অক্ষুণ্ণ থাকে এবং দীর্ঘদিনের শত্রুতা চিরতরে বিলুপ্ত হয়।
দেওয়ানি মোকদ্দমায় সোলেনামা গ্রহণের আইনি ভিত্তি হলো দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮ (Code of Civil Procedure, 1908)-এর আদেশ ২৩ নিয়ম ৩ (Order XXIII Rule 3)। এই বিধিতে বলা হয়েছে:
"যেখানে আদালতের নিকট ইহা সন্তোষজনকভাবে প্রমাণিত হয় যে, কোনো মামলা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে কোনো বৈধ চুক্তি বা আপসের মাধ্যমে মীমাংসা করা হইয়াছে... সেখানে আদালত উক্ত চুক্তি, আপস বা পরিতোষ লিপিবদ্ধ করিবার নির্দেশ দিবেন এবং উক্ত চুক্তি অনুসারে মামলার সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ নিষ্পত্তিপূর্বক একটি ডিক্রি জারি করিবেন।"
এই বিধির আলোকে আদালত নিশ্চিত হন যে আপসটি সম্পূর্ণ বৈধ, কোনো পক্ষকে বলপ্রয়োগ বা প্রতারণা করা হয়নি এবং আপসের শর্তাবলী বিদ্যমান আইনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আদালত সন্তুষ্ট হলে সোলেনামার সম্পূর্ণ বয়ান রায়ের অংশে অন্তর্ভুক্ত করে ডিক্রি জারি করেন।
সাধারণত সমস্ত দেওয়ানি মোকদ্দমাতেই সোলেনামা সম্পাদন করা যায়। তবে প্র্যাকটিস কোর্টে সবচেয়ে বেশি যেসব মামলায় সোলেনামা হয়:
একটি সোলেনামা যেন ভবিষ্যতে পুনরায় কোনো নতুন মামলার জন্ম না দেয়, সে জন্য এর খসড়া তৈরিতে বিজ্ঞ আইনজীবীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। একটি আদর্শ সোলেনামায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে থাকতে হবে:
যদি পক্ষদের মধ্যে কোনো নাবালক (Minor) থাকে, তবে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩২ নিয়ম ৭ অনুযায়ী বিজ্ঞ আদালতের নিকট থেকে নাবালকের কল্যাণে আপসের জন্য পূর্বেই বিশেষ অনুমতি (Special Leave of Court) গ্রহণ করতে হয়। আদালতের অনুমতি ছাড়া নাবালকের পক্ষে করা সোলেনামা বাতিলযোগ্য হয়।
কেবল কাগজে সোলেনামা তৈরি করে স্বাক্ষর করলেই তা কার্যকর হয় না। এটিকে আদালতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় দাখিল ও প্রমাণ করতে হয়:
ধাপ ১: যৌথ দরখাস্ত দাখিল: উভয় পক্ষের আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আদেশ ২৩ নিয়ম ৩ মতে যৌথ সোলেনামার আবেদন পেশ করতে হয়।
ধাপ ২: কাঠগড়ায় সশরীরে হাজিরা: মামলার সমস্ত পক্ষকে (বাদী ও বিবাদী) বিজ্ঞ বিচারকের এজলাসে বা কাঠগড়ায় সশরীরে উপস্থিত হতে হয়।
ধাপ ৩: বিজ্ঞ বিচারকের জেরা ও স্বীকারোক্তি: বিজ্ঞ বিচারক নিজে সরাসরি প্রতিটি পক্ষকে নাম জিজ্ঞাসা করেন, সোলেনামার শর্ত পড়ে শোনান এবং জিজ্ঞাসা করেন—"আপনারা কি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে, কারো কোনো চাপ বা প্ররোচনা ছাড়া এই সোলেনামায় স্বাক্ষর করেছেন?"
ধাপ ৪: আদালতে দ্বিতীয়বার স্বাক্ষর: বিচারকের প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারকের সামনে হাজিরা শিটে বা সোলেনামায় পুনরায় স্বাক্ষর বা টিপসহি দিতে হয়। বিজ্ঞ বিচারক তখন আদেশপত্রে তা লিপিবদ্ধ করেন।
পক্ষগণের স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করার পর বিজ্ঞ আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে রায় প্রদান করেন এবং সেই রায়ের ওপর ভিত্তি করে একটি "সোলে ডিক্রি" (Compromise Decree) প্রস্তুত করা হয়।
সোলে ডিক্রির কিছু অনন্য আইনি বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
সাধারণ ডিক্রির ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ পক্ষ উচ্চ আদালতে নিয়মিত আপিল করতে পারেন। কিন্তু সোলে ডিক্রির ক্ষেত্রে দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর ৯৬(৩) ধারায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে:
"No appeal shall lie from a decree passed by the Court with the consent of parties." (উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে কোনো আপিল চলবে না।)
যেহেতু উভয় পক্ষ স্বেচ্ছায় আদালতে এসে বিচারকের সামনে আপসে স্বাক্ষর করেছেন, তাই আইন কোনো পক্ষকেই পরবর্তীতে মত পরিবর্তন করে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ দেয় না। এটি বিরোধের চিরস্থায়ী সমাপ্তি নিশ্চিত করে।
যদি কেউ অন্য কোনো পক্ষকে ভুল বুঝিয়ে, নেশাগ্রস্ত করে, অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে বা ভুয়া ব্যক্তিকে আদালতে খাড়া করে জালিয়াতির মাধ্যমে সোলেনামা করিয়ে নেয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ কীভাবে তা বাতিল করবেন? দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২৩ নিয়ম ৩এ (Order XXIII Rule 3A CPC) এই ক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষা দিয়েছে।
| বিষয় | ভুল পদ্ধতি (Dismissed) | সঠিক আইনি পদ্ধতি (Maintainable) |
|---|---|---|
| নতুন মামলা দায়ের | আলাদা নতুন স্বত্ব বা বাটোয়ারা মামলা করা আইনত নিষিদ্ধ | যে আদালত সোলে ডিক্রি দিয়েছিলেন ঠিক সেই আদালতেই দরখাস্ত করতে হবে |
| আইনি ধারা | সরাসরি উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করা | সিপিসির আদেশ ২৩ নিয়ম ৩এ এবং ১৫১ ধারায় (Inherent Power) দরখাস্ত দাখিল |
| প্রমাণের বিষয়বস্তু | সাধারণভাবে শর্ত ভঙ্গ হয়েছে দাবি করা | আদালতকে ধোঁকা দেওয়া (Fraud upon Court), ব্যক্তিবদল বা স্বাক্ষর জালিয়াতি অকাট্যভাবে প্রমাণ করা |
বাটোয়ারা বা সম্পত্তি বণ্টন মোকদ্দমায় সোলেনামা হলো এক আশীর্বাদস্বরূপ। সাধারণত বাটোয়ারা মামলায় প্রাথমিক ডিক্রি (Preliminary Decree) হওয়ার পর অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করা হয়। কমিশনার সরেজমিনে গিয়ে জমি মাপজোক করে সহম বণ্টন প্রতিবেদন (Final Saham Report) প্রস্তুত করেন, যা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। পক্ষগণ যদি সোলেনামার মাধ্যমে নিজেরাই নিজ নিজ দখলীয় অংশ চিহ্নিত করে আপসনামা জমা দেন, তবে আদালত স্বল্প সময়ে চূড়ান্ত ডিক্রি প্রদান করেন এবং পরিবারের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী বিবাদ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
দেওয়ানি মামলার মতো ফৌজদারি সমস্ত অপরাধে সোলেনামা চলে না। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৩৪৫ ধারা অনুযায়ী কেবল আপসযোগ্য (Compoundable) অপরাধসমূহে আপসনামা আদালতে দাখিল করা যায়:
সোলেনামা সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা করেছেন:
১. মোয়াজ্জেম হোসেন বনাম আব্দুল লতিফ (48 DLR): সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ দেন যে, সোলেনামায় যদি কোনো একজন সহ-শরিকের স্বাক্ষর জাল করা হয় বা তাকে পক্ষ না করে বাদ দেওয়া হয়, তবে সেই সোলেনামা সমগ্র ডিক্রিকেই বাতিল ও অকার্যকর করে দেবে।
২. জাহানারা বেগম বনাম খলিলুর রহমান (39 DLR AD): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, প্রতারণার মাধ্যমে সোলে ডিক্রি হাসিল করা হলে আদালত তার নিজস্ব অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (Section 151 CPC) প্রয়োগ করে যেকোনো সময় সেই ডিক্রি প্রত্যাহার বা বাতিল করতে পারেন।
কোনো সোলেনামায় সই করার পূর্বে একজন মক্কেলের অবশ্যই নিম্নলিখিত বিষয়গুলো সরেজমিনে মিলিয়ে নেওয়া উচিত:
সোলেনামা হলো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর একটি আইনি নথি। একবার সোলেনামা আদালতে পাস হয়ে গেলে তা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। তাই তাড়াহুড়ো করে বা কোনো মধ্যস্থতাকারীর মিথ্যা আশ্বাসে বিশ্বাস করে সোলেনামায় সই করবেন না। আপনার পক্ষে নিযুক্ত বিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবীকে দিয়ে প্রতিটি ধারা ও চৌহদ্দি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করিয়ে তবেই আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করুন। সঠিক সোলেনামা আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শত বছরের আইনি বিড়ম্বনা থেকে মুক্ত রাখবে।