সোলে নামা (সোলেনামা) কি? দেওয়ানি ও পারিবারিক আদালতে আপস নিষ্পত্তির শর্তাবলী ও বাতিলের নিয়ম ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06 · ১৫ মিনিট

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

<p>আদালতে বছরের পর বছর মামলা লড়ে উভয় পক্ষেরই বিপুল অর্থ, মূল্যবান সময় এবং শারীরিক-মানসিক শান্তি বিনষ্ট হয়। বিশেষ করে জমিজমার দেওয়ানি মোকদ্দমা এবং পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গড়ায়। এই দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্তির সবচেয়ে কার্যকর, সম্মানজনক ও নিরাপদ আইনি উপায় হলো "সোলেনামা" বা আপস নিষ্পত্তি (Compromise/Settlement)। দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর আদেশ ২৩ নিয়ম ৩ অনুযায়ী মামলার যেকোনো পর্যায়ে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষ পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে আপস নিষ্পত্তির মাধ্যমে মোকদ্দমা চূড়ান্তভাবে শেষ করতে পারেন। তবে সোলেনামায় কী কী শর্ত অন্তর্ভুক্ত করতে হয়, কীভাবে আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে স্বীকারোক্তি দিতে হয় এবং কোনো পক্ষ প্রতারণা করে সোলেনামা সম্পাদন করলে তা কীভাবে বাতিল করা যায়—তা সাধারণ মানুষের জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো। পরামর্শে: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>

: · দেওয়ানি ও জমি বাটোয়ারা মামলা আইনজীবী

এক নজরে মূল তথ্য (Quick Answer Table)

বিষয় / শর্তসরকারি নিয়ম, ফি ও আইন (২০২৬)
প্রযোজ্য আইন ও আদালতবাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (CrPC) ও সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ
আগাম ও নিয়মিত জামিনহাইকোর্ট বিভাগে আগাম জামিন (ধারা ৪৯৮ CrPC) ও ম্যাজিস্ট্রেট/দায়রা আদালতে নিয়মিত জামিন
সরকারি পোর্টাল ও যাচাইsupremecourt.gov.bd, judiciary.gov.bd, pcc.police.gov.bd ও land.gov.bd
জরুরি আইনি পরামর্শ চেম্বারঅ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট) — ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬
⚡ সোলেনামা ও সোলে ডিক্রি — একনজরে মূল আইনি তথ্য
  • সোলেনামা হলো আদালতে বিচারাধীন মামলার বাদী ও বিবাদীর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত একটি বৈধ লিখিত আপস চুক্তিপত্র।
  • দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর আদেশ ২৩ নিয়ম ৩ (Order XXIII Rule 3 CPC) অনুযায়ী বিজ্ঞ আদালত সোলেনামার ভিত্তিতে চূড়ান্ত "সোলে ডিক্রি" (Compromise Decree) প্রচার করেন।
  • দেওয়ানি কার্যবিধির ৯৬(৩) ধারা অনুযায়ী পক্ষগণের সম্মতিতে প্রদত্ত সোলে ডিক্রির বিরুদ্ধে কোনো উচ্চ আদালতে নিয়মিত আপিল (Appeal) দায়ের করা যায় না।
  • তবে যদি জালিয়াতি, প্রতারণা বা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সোলেনামা করিয়ে নেওয়া হয়, তবে আদেশ ২৩ নিয়ম ৩এ (Order XXIII Rule 3A) অনুযায়ী সেই একই আদালতে সোলেনামা বাতিলের দরখাস্ত করতে হয়।
  • পারিবারিক আদালত ও দেওয়ানি বাটোয়ারা (বণ্টন) মোকদ্দমায় সোলেনামা হলো বিবাদ চিরতরে সমাপ্ত করার সবচেয়ে নিখুঁত আইনি সমাধান।
📋 সূচিপত্র
  1. ১. সোলেনামা (Sole Nama) কী এবং এর আইনি তাৎপর্য
  2. ২. দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২৩ নিয়ম ৩: আপস নিষ্পত্তির আইনি ভিত্তি
  3. ৩. কোন কোন মামলায় সোলেনামা সম্পাদন করা যায়?
  4. ৪. একটি ত্রুটিমুক্ত বৈধ সোলেনামার মূল শর্তাবলী ও খসড়া তৈরির নিয়ম
  5. ৫. বিজ্ঞ আদালতে সোলেনামা দাখিল ও পক্ষগণের স্বীকারোক্তি গ্রহণ
  6. ৬. সোলে ডিক্রি (Compromise Decree) প্রচার ও এর স্থায়ী কার্যকারিতা
  7. ৭. সোলে ডিক্রির বিরুদ্ধে কি আপিল বা রিভিশন করা যায়? ধারা ৯৬(৩) সিপিসি
  8. ৮. প্রতারণা বা জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া সোলেনামা বাতিলের নিয়ম (Order 23 Rule 3A)
  9. ৯. পারিবারিক ও বণ্টন (বাটোয়ারা) মামলায় সোলেনামার বাস্তব সুফল
  10. ১০. ফৌজদারি মামলায় কি সোলেনামা প্রযোজ্য? আপসযোগ্য ধারার তালিকা
  11. ১১. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় ও নজির (DLR Reference)
  12. ১২. সোলেনামা স্বাক্ষরের আগে মক্কেলের করণীয় চূড়ান্ত চেকলিস্ট
  13. ১৩. অভিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবীর পরামর্শ ও সতর্কতা

১. সোলেনামা (Sole Nama) কী এবং এর আইনি তাৎপর্য

"সোলে" শব্দটি আরবি "সুলহ" (Sulh) থেকে এসেছে, যার আভিধানিক অর্থ হলো আপস, সমঝোতা বা পুনর্মিলন। আর "নামা" ফারসি শব্দ যার অর্থ পত্র বা লিখিত দলিল। সুতরাং সহজ কথায়, সোলেনামা হলো আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলার বিবদমান পক্ষসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পাদিত লিখিত আপস চুক্তিপত্র।

আদালতের একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে—"A bad compromise is better than a good trial." অর্থাৎ বছরের পর বছর আদালতে মামলা চালিয়ে জয়ী হওয়ার চেয়ে কিছুটা ছাড় দিয়ে একটি সম্মানজনক আপস নিষ্পত্তি অনেক বেশি লাভজনক। দেওয়ানি মামলায় একটি চূড়ান্ত রায় আসতে ১০ থেকে ২০ বছর সময় লেগে যেতে পারে। এই দীর্ঘ সময়ে উভয় পক্ষের লাখ লাখ টাকা কোর্ট ফি, আইনজীবীর ফি ও যাতায়াতে খরচ হয়। সোলেনামার মাধ্যমে পক্ষগণ কোনো তিক্ততা ছাড়াই মামলা শেষ করে নিজেদের সম্পত্তি ও অধিকার চিরতরে সুরক্ষিত করতে পারেন।

সোলেনামার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে কোনো পক্ষের হার বা জয়ের গ্লানি থাকে না। উভয় পক্ষ নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে একটি মাঝামাঝি সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এর ফলে পারিবারিক ও সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ অক্ষুণ্ণ থাকে এবং দীর্ঘদিনের শত্রুতা চিরতরে বিলুপ্ত হয়।

২. দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২৩ নিয়ম ৩: আপস নিষ্পত্তির আইনি ভিত্তি

দেওয়ানি মোকদ্দমায় সোলেনামা গ্রহণের আইনি ভিত্তি হলো দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮ (Code of Civil Procedure, 1908)-এর আদেশ ২৩ নিয়ম ৩ (Order XXIII Rule 3)। এই বিধিতে বলা হয়েছে:

"যেখানে আদালতের নিকট ইহা সন্তোষজনকভাবে প্রমাণিত হয় যে, কোনো মামলা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে কোনো বৈধ চুক্তি বা আপসের মাধ্যমে মীমাংসা করা হইয়াছে... সেখানে আদালত উক্ত চুক্তি, আপস বা পরিতোষ লিপিবদ্ধ করিবার নির্দেশ দিবেন এবং উক্ত চুক্তি অনুসারে মামলার সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ নিষ্পত্তিপূর্বক একটি ডিক্রি জারি করিবেন।"

এই বিধির আলোকে আদালত নিশ্চিত হন যে আপসটি সম্পূর্ণ বৈধ, কোনো পক্ষকে বলপ্রয়োগ বা প্রতারণা করা হয়নি এবং আপসের শর্তাবলী বিদ্যমান আইনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আদালত সন্তুষ্ট হলে সোলেনামার সম্পূর্ণ বয়ান রায়ের অংশে অন্তর্ভুক্ত করে ডিক্রি জারি করেন।

৩. কোন কোন মামলায় সোলেনামা সম্পাদন করা যায়?

সাধারণত সমস্ত দেওয়ানি মোকদ্দমাতেই সোলেনামা সম্পাদন করা যায়। তবে প্র্যাকটিস কোর্টে সবচেয়ে বেশি যেসব মামলায় সোলেনামা হয়:

  • বণ্টন মোকদ্দমা (Partition Suit): শরিকদের মধ্যে সম্পত্তির দাগ, খতিয়ান ও চৌহদ্দি সুনির্দিষ্টভাবে কে কোন অংশ পাবেন তা সোলেনামার মাধ্যমে স্থির করা হয়।
  • স্বত্ব ঘোষণার মামলা (Title Suit): জমির মালিকানা ও দখলের সীমা নিয়ে বিরোধের স্থায়ী অবসান ঘটাতে।
  • টাকা আদায়ের মামলা (Money Suit): পাওনাদার ও দেনাদারের মধ্যে বকেয়া টাকার পরিমাণ ও কিস্তির শর্ত নির্ধারণে।
  • পারিবারিক মামলা (Family Suit): দেনমোহর, বকেয়া খোরপোষ ও সন্তানের হেফাজত (Custody) নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আপস।
  • উচ্ছেদ মামলা (Eviction Suit): বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে দখল হস্তান্তর বা বকেয়া ভাড়ার সমাধান।

৪. একটি ত্রুটিমুক্ত বৈধ সোলেনামার মূল শর্তাবলী ও খসড়া তৈরির নিয়ম

একটি সোলেনামা যেন ভবিষ্যতে পুনরায় কোনো নতুন মামলার জন্ম না দেয়, সে জন্য এর খসড়া তৈরিতে বিজ্ঞ আইনজীবীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। একটি আদর্শ সোলেনামায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে থাকতে হবে:

  1. মামলার পূর্ণ বিবরণ: আদালতের নাম, মামলার নম্বর, বাদী ও বিবাদীগণের নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর।
  2. সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দি: জমির জেলা, থানা, মৌজা, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং কে কোন দিকে কতটুকু জমি পাবেন তার সুস্পষ্ট উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমের চৌহদ্দি ও হাত-নকশা।
  3. দাবি ত্যাগ ও ছাড়পত্র: কোনো পক্ষ অপর পক্ষের প্রাপ্য অংশের ওপর ভবিষ্যতে কোনো দাবি করবেন না এবং স্বত্ব নিঃশর্তভাবে মেনে নিচ্ছেন তার অঙ্গীকার।
  4. পক্ষগণের নিজ স্বাক্ষর বা টিপসহি: প্রতিটি পাতায় বাদী, বিবাদী এবং তাদের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ আইনজীবীদের স্পষ্ট স্বাক্ষর বা টিপসহি থাকতে হবে।

যদি পক্ষদের মধ্যে কোনো নাবালক (Minor) থাকে, তবে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩২ নিয়ম ৭ অনুযায়ী বিজ্ঞ আদালতের নিকট থেকে নাবালকের কল্যাণে আপসের জন্য পূর্বেই বিশেষ অনুমতি (Special Leave of Court) গ্রহণ করতে হয়। আদালতের অনুমতি ছাড়া নাবালকের পক্ষে করা সোলেনামা বাতিলযোগ্য হয়।

৫. বিজ্ঞ আদালতে সোলেনামা দাখিল ও পক্ষগণের স্বীকারোক্তি গ্রহণ

কেবল কাগজে সোলেনামা তৈরি করে স্বাক্ষর করলেই তা কার্যকর হয় না। এটিকে আদালতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় দাখিল ও প্রমাণ করতে হয়:

ধাপ ১: যৌথ দরখাস্ত দাখিল: উভয় পক্ষের আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আদেশ ২৩ নিয়ম ৩ মতে যৌথ সোলেনামার আবেদন পেশ করতে হয়।

ধাপ ২: কাঠগড়ায় সশরীরে হাজিরা: মামলার সমস্ত পক্ষকে (বাদী ও বিবাদী) বিজ্ঞ বিচারকের এজলাসে বা কাঠগড়ায় সশরীরে উপস্থিত হতে হয়।

ধাপ ৩: বিজ্ঞ বিচারকের জেরা ও স্বীকারোক্তি: বিজ্ঞ বিচারক নিজে সরাসরি প্রতিটি পক্ষকে নাম জিজ্ঞাসা করেন, সোলেনামার শর্ত পড়ে শোনান এবং জিজ্ঞাসা করেন—"আপনারা কি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে, কারো কোনো চাপ বা প্ররোচনা ছাড়া এই সোলেনামায় স্বাক্ষর করেছেন?"

ধাপ ৪: আদালতে দ্বিতীয়বার স্বাক্ষর: বিচারকের প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারকের সামনে হাজিরা শিটে বা সোলেনামায় পুনরায় স্বাক্ষর বা টিপসহি দিতে হয়। বিজ্ঞ বিচারক তখন আদেশপত্রে তা লিপিবদ্ধ করেন।

৬. সোলে ডিক্রি (Compromise Decree) প্রচার ও এর স্থায়ী কার্যকারিতা

পক্ষগণের স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করার পর বিজ্ঞ আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে রায় প্রদান করেন এবং সেই রায়ের ওপর ভিত্তি করে একটি "সোলে ডিক্রি" (Compromise Decree) প্রস্তুত করা হয়।

সোলে ডিক্রির কিছু অনন্য আইনি বৈশিষ্ট্য রয়েছে:

  • চূড়ান্ত স্বত্ব তৈরি: সোলে ডিক্রি একটি রেজিস্ট্রার্ড দলিলের চেয়েও শক্তিশালী আইনগত দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। এর মাধ্যমে সম্পত্তিতে নিরঙ্কুশ ও চূড়ান্ত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • রেস জুডিকাটা (Res Judicata): একই বিষয় এবং একই পক্ষগণের মধ্যে পুনরায় নতুন করে কোনো মামলা দায়ের করা আইনত নিষিদ্ধ (দেওয়ানি কার্যবিধির ১১ ধারা)।
  • নামজারি ও খারিজ: সোলে ডিক্রির সার্টিফাইড কপি দিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসে আবেদন করে খুব সহজেই নিজ নামে নতুন খতিয়ান বা নামজারি করা যায়।

৭. সোলে ডিক্রির বিরুদ্ধে কি আপিল বা রিভিশন করা যায়? ধারা ৯৬(৩) সিপিসি

সাধারণ ডিক্রির ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ পক্ষ উচ্চ আদালতে নিয়মিত আপিল করতে পারেন। কিন্তু সোলে ডিক্রির ক্ষেত্রে দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর ৯৬(৩) ধারায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে:

"No appeal shall lie from a decree passed by the Court with the consent of parties." (উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে কোনো আপিল চলবে না।)

যেহেতু উভয় পক্ষ স্বেচ্ছায় আদালতে এসে বিচারকের সামনে আপসে স্বাক্ষর করেছেন, তাই আইন কোনো পক্ষকেই পরবর্তীতে মত পরিবর্তন করে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ দেয় না। এটি বিরোধের চিরস্থায়ী সমাপ্তি নিশ্চিত করে।

⚖️ আইনি কেস মূল্যায়ন ও চেম্বার অ্যাপয়েন্টমেন্ট

আপনার জমি বিরোধ, বাটোয়ারা মামলা, জামিন, তালাক বা সাইবার জটিলতায় বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে সুপ্রিম কোর্ট বা উত্তরা চেম্বারে নথিপত্রসহ সরাসরি বসুন।

জরুরি হোয়াটসঅ্যাপ সরাসরি কল: ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬

৮. প্রতারণা বা জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া সোলেনামা বাতিলের নিয়ম (Order 23 Rule 3A)

যদি কেউ অন্য কোনো পক্ষকে ভুল বুঝিয়ে, নেশাগ্রস্ত করে, অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে বা ভুয়া ব্যক্তিকে আদালতে খাড়া করে জালিয়াতির মাধ্যমে সোলেনামা করিয়ে নেয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ কীভাবে তা বাতিল করবেন? দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২৩ নিয়ম ৩এ (Order XXIII Rule 3A CPC) এই ক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষা দিয়েছে।

বিষয় ভুল পদ্ধতি (Dismissed) সঠিক আইনি পদ্ধতি (Maintainable)
নতুন মামলা দায়ের আলাদা নতুন স্বত্ব বা বাটোয়ারা মামলা করা আইনত নিষিদ্ধ যে আদালত সোলে ডিক্রি দিয়েছিলেন ঠিক সেই আদালতেই দরখাস্ত করতে হবে
আইনি ধারা সরাসরি উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করা সিপিসির আদেশ ২৩ নিয়ম ৩এ এবং ১৫১ ধারায় (Inherent Power) দরখাস্ত দাখিল
প্রমাণের বিষয়বস্তু সাধারণভাবে শর্ত ভঙ্গ হয়েছে দাবি করা আদালতকে ধোঁকা দেওয়া (Fraud upon Court), ব্যক্তিবদল বা স্বাক্ষর জালিয়াতি অকাট্যভাবে প্রমাণ করা

৯. পারিবারিক ও বণ্টন (বাটোয়ারা) মামলায় সোলেনামার বাস্তব সুফল

বাটোয়ারা বা সম্পত্তি বণ্টন মোকদ্দমায় সোলেনামা হলো এক আশীর্বাদস্বরূপ। সাধারণত বাটোয়ারা মামলায় প্রাথমিক ডিক্রি (Preliminary Decree) হওয়ার পর অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করা হয়। কমিশনার সরেজমিনে গিয়ে জমি মাপজোক করে সহম বণ্টন প্রতিবেদন (Final Saham Report) প্রস্তুত করেন, যা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। পক্ষগণ যদি সোলেনামার মাধ্যমে নিজেরাই নিজ নিজ দখলীয় অংশ চিহ্নিত করে আপসনামা জমা দেন, তবে আদালত স্বল্প সময়ে চূড়ান্ত ডিক্রি প্রদান করেন এবং পরিবারের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী বিবাদ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

১০. ফৌজদারি মামলায় কি সোলেনামা প্রযোজ্য? আপসযোগ্য ধারার তালিকা

দেওয়ানি মামলার মতো ফৌজদারি সমস্ত অপরাধে সোলেনামা চলে না। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৩৪৫ ধারা অনুযায়ী কেবল আপসযোগ্য (Compoundable) অপরাধসমূহে আপসনামা আদালতে দাখিল করা যায়:

  • আদালতের অনুমতি ছাড়া আপসযোগ্য: ছোটখাটো মারামারি (দণ্ডবিধি ৩২৩ ধারা), অবমাননাকর গালিগালাজ (৫০৪ ধারা), মানহানি (৫০০ ধারা), অনধিকার প্রবেশ (৪৪৭ ধারা)।
  • আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে আপসযোগ্য: দ্বিতীয় বিয়ে (৪৯৪ ধারা), বিশ্বাসভঙ্গ (৪০৬ ধারা), সাধারণ প্রতারণা (৪২০ ধারা), সাধারণ চুরি (৩৭৯ ধারা)।
  • সম্পূর্ণ আপস-অযোগ্য: খুন (৩০২ ধারা), ডাকাতি (৩৯৫ ধারা), ধর্ষণ (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন) ইত্যাদি জঘন্য অপরাধে কোনো সোলেনামা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।

১১. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় ও নজির (DLR Reference)

সোলেনামা সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা করেছেন:

১. মোয়াজ্জেম হোসেন বনাম আব্দুল লতিফ (48 DLR): সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ দেন যে, সোলেনামায় যদি কোনো একজন সহ-শরিকের স্বাক্ষর জাল করা হয় বা তাকে পক্ষ না করে বাদ দেওয়া হয়, তবে সেই সোলেনামা সমগ্র ডিক্রিকেই বাতিল ও অকার্যকর করে দেবে।

২. জাহানারা বেগম বনাম খলিলুর রহমান (39 DLR AD): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, প্রতারণার মাধ্যমে সোলে ডিক্রি হাসিল করা হলে আদালত তার নিজস্ব অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (Section 151 CPC) প্রয়োগ করে যেকোনো সময় সেই ডিক্রি প্রত্যাহার বা বাতিল করতে পারেন।

১২. সোলেনামা স্বাক্ষরের আগে মক্কেলের করণীয় চূড়ান্ত চেকলিস্ট

কোনো সোলেনামায় সই করার পূর্বে একজন মক্কেলের অবশ্যই নিম্নলিখিত বিষয়গুলো সরেজমিনে মিলিয়ে নেওয়া উচিত:

  • ১. আপনার প্রাপ্ত জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও শতাংশের পরিমাণ দলিলের সাথে ঠিক আছে কিনা মিলিয়ে নিন।
  • ২. আপনার অংশের চতুর্দিকের চৌহদ্দি (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম) কার জমি তা সরেজমিন মেপে দেখুন।
  • ৩. রাস্তা বা চলাচলের পথ নিশ্চিত করা হয়েছে কিনা তা নকশায় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে কিনা যাচাই করুন।
  • ৪. সোলেনামার প্রতিটি পাতায় আপনার পূর্ণ স্বাক্ষর করুন; শুধু শেষ পাতায় সই করে খালি পাতা রাখবেন না।
  • ৫. সোলেনামা দাখিলের দিন কোনো অপরিচিত ব্যক্তি যেন আপনার সাথে বিচারকের সামনে না দাঁড়ায়।

১৩. অভিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবীর পরামর্শ ও সতর্কতা

সোলেনামা হলো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর একটি আইনি নথি। একবার সোলেনামা আদালতে পাস হয়ে গেলে তা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। তাই তাড়াহুড়ো করে বা কোনো মধ্যস্থতাকারীর মিথ্যা আশ্বাসে বিশ্বাস করে সোলেনামায় সই করবেন না। আপনার পক্ষে নিযুক্ত বিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবীকে দিয়ে প্রতিটি ধারা ও চৌহদ্দি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করিয়ে তবেই আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করুন। সঠিক সোলেনামা আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শত বছরের আইনি বিড়ম্বনা থেকে মুক্ত রাখবে।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

সোলেনামা হওয়ার পর কি কোনো পক্ষ আবার মামলা করতে পারে?

না, বৈধ সোলেনামার ভিত্তিতে সোলে ডিক্রি জারি হওয়ার পর দেওয়ানি কার্যবিধির ১১ ধারা (রেস জুডিকাটা) অনুযায়ী একই বিরোধ নিয়ে কোনো পক্ষ পুনরায় নতুন মামলা করতে পারে না।

সোলেনামার বিরুদ্ধে কি উচ্চ আদালতে আপিল করা যায়?

দেওয়ানি কার্যবিধির ৯৬(৩) ধারা অনুযায়ী পক্ষগণের সম্মতিক্রমে প্রদত্ত সোলে ডিক্রির বিরুদ্ধে কোনো নিয়মিত আপিল চলে না।

যদি প্রতারণা বা জালিয়াতি করে সোলেনামা করা হয় তবে কী করণীয়?

প্রতারণার শিকার হলে আদেশ ২৩ নিয়ম ৩এ এবং ১৫১ ধারায় যে আদালত সোলে ডিক্রি দিয়েছিলেন ঠিক সেই আদালতেই মিস কেস (Misc Case) বা দরখাস্ত দাখিল করে ডিক্রি বাতিলের আবেদন করতে হয়।

সোলেনামা দিয়ে কি সরাসরি জমির নামজারি বা খারিজ করা যায়?

হ্যাঁ, সোলে ডিক্রির সার্টিফাইড কপি ও খতিয়ান নিয়ে এসি ল্যান্ড অফিসে আবেদন করলে কোনো অতিরিক্ত দলিল ছাড়াই আবেদনকারীর নামে সরাসরি নামজারি ও জমাভাগ খতিয়ান তৈরি হয়।

চেক বাউন্স বা এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারার মামলায় কি সোলেনামা করা যায়?

হ্যাঁ, এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারার মামলা জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য। আসামি বাদীর পাওনা টাকা পরিশোধ করলে উভয় পক্ষ যৌথ সোলেনামা দাখিল করে মামলাটি খারিজ বা প্রত্যাহার করে নিতে পারেন।

দায়বর্জন (Disclaimer): এই আর্টিকেলে পরিবেশিত তথ্যসমূহ কেবল আইনি সচেতনতা ও সাধারণ শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো প্রত্যক্ষ আইনি পরামর্শ (Legal Advice) নয় এবং এর মাধ্যমে কোনো আইনজীবী-মক্কেল সম্পর্ক (Attorney-Client Relationship) তৈরি হয় না। আপনার সুনির্দিষ্ট মামলার আইনি প্রতিকারের জন্য সরাসরি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বা জজ কোর্টের তালিকাভুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।
আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546  |  WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০