লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-13
ব্যবসায়িক লেনদেন কিংবা বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনকে বিশ্বাসের ওপর ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা (Promissory Note / Agreement) করিয়ে লাখ লাখ টাকা ধার দিয়ে পরে বিপদে পড়েছেন বহু মানুষ। চেক না থাকলেও শুধুমাত্র স্ট্যাম্প চুক্তির ভিত্তিতে কীভাবে দেওয়ানি আদালত থেকে রায় নিয়ে দেনাদারের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের মাধ্যমে টাকা আদায় করবেন, তা নিয়ে আইনি পর্যালোচনা করেছেন অভিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।
দ্য স্ট্যাম্প অ্যাক্ট ১৮৯৯ এবং চুক্তি আইন ১৮৭২ অনুসারে—নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরিত যেকোনো আর্থিক অঙ্গীকারনামা বা ঋণচুক্তি সম্পূর্ণ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক দলিল। এতে ঋণগ্রহীতার স্বাক্ষর, আঙুলের ছাপ, সাক্ষীদের পরিচয় এবং সুনির্দিষ্ট পরিশোধের সময়সীমা উল্লেখ থাকলে তা আদালতে অখণ্ডনীয় প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
টাকা ফেরত না পেয়ে বেশিরভাগ মানুষ তাড়াহুড়ো করে সোজা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে গিয়ে দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০ ধারায় প্রতারণার মামলা ঠুকে দেন। কিন্তু আদালতের এজলাসে দাঁড়িয়ে দেখা যায়—টাকা ধার দেওয়ার ঘটনাটি শুরু থেকেই কোনো অপরাধমূলক উদ্দেশ্য নিয়ে হয়নি বরং এটি একটি দেওয়ানি প্রকৃতির ঋণ ছিল। ফলে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রায়ই মামলাটি ‘দেওয়ানি প্রকৃতির লেনদেন’ বলে খারিজ করে দেন। তাই শুরু থেকেই সঠিক দেওয়ানি আদালতে পদক্ষেপ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
অঙ্গীকারনামার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট বা জজ কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে (AD সহ) দেনাদারের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় একটি বিধিসম্মত লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে। নোটিশে টাকা পরিশোধের জন্য ৩০ দিনের সময় দিতে হবে এবং সতর্ক করতে হবে যে ব্যর্থতায় দেওয়ানি আদালতে সুদসহ ডিক্রি মামলা দায়ের করা হবে।
নোটিশের মেয়াদ পার হওয়ার পর তামাদি আইন ১৯০৮-এর নির্দিষ্ট সময়সীমার (সাধারণত ঋণ খেলাপির তারিখ থেকে ৩ বছর) মধ্যে সংশ্লিষ্ট যুগ্ম জেলা জজ আদালতে অর্থ উদ্ধার বা মানি মোকদ্দমা (Money Suit) দায়ের করতে হবে। আর্জির সাথে মূল স্ট্যাম্প চুক্তি, ব্যাংকের স্টেটমেন্ট বা টাকা হস্তান্তরের প্রমাণাদি দাখিল করতে হয়।
মানি স্যুটে দাবি করা টাকার ওপর অ্যাড-ভ্যালোরেম (Ad-valorem) কোর্ট ফি প্রদান করতে হয়। কোর্ট ফি অ্যাক্ট ১৮৭০ অনুযায়ী দাবিকৃত পরিমাণের আনুপাতিক হারে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত সরকারি কোর্ট ফি নির্ধারিত রয়েছে। মামলার ডিক্রি হলে বিজ্ঞ আদালত এই কোর্ট ফি এবং মামলার সমস্ত খরচ দেনাদারের নিকট থেকেই বাদীর অনুকূলে আদায় করে দেন।
দেনাদার যাতে মামলা চলাকালীন তার বাড়ি, জমি বা গাড়ি গোপনে অন্যের নামে বিক্রি করে দিয়ে নিজেকে সর্বস্বান্ত দেখাতে না পারে, সেজন্য দেওয়ানি কার্যবিধির অর্ডার ৩৮ রুল ৫ অনুযায়ী ডিক্রির পূর্বেই তার সম্পত্তি ‘ক্রোক’ (Attachment before Judgment) করার জোরদার আবেদন করতে হয়।
আদালত থেকে মানি স্যুটের ডিক্রি পাওয়ার পর দেনাদার টাকা না দিলে দেওয়ানি কার্যবিধির অর্ডার ২১ অনুযায়ী ‘অর্থজারি মোকদ্দমা’ (Execution Case) দায়ের করা হয়। আদালত নিলামের মাধ্যমে দেনাদারের জমি বা বাড়ি বিক্রি করে বাদীর পাওনা টাকা বুঝিয়ে দেন এবং টাকা পরিশোধে গড়িমসি করলে দেনাদারকে সর্বোচ্চ ৬ মাসের জন্য সিভিল জেলে আটক রাখার আদেশ দেন।