লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>দাম্পত্য জীবনে স্বামীর মাদকাসক্তি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পরকীয়া, বা বছরের পর বছর কোনো ভরণপোষণ না দেওয়ার কারণে যখন কোনো নারী চরম দুর্বিষহ জীবনযাপন করেন এবং একসাথে আর কোনোভাবেই সংসার চালানো সম্ভব হয় না, তখন একজন স্ত্রীর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আসে—<em>"আমি কি একজন নারী হিসেবে আমার স্বামীকে আইনগতভাবে ডিভোর্স দিতে পারি? দিলে কীভাবে দিতে হবে? এবং সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা—আমি যদি নিজে ডিভোর্স দিই, তবে কি আমার কাবিনের দেনমোহরের টাকা মাফ হয়ে যাবে?"</em> বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এবং মুসলিম শরিয়া আইন নারীকে স্বামীর অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার স্পষ্ট আইনি অধিকার দিয়েছে। কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে অর্পিত ক্ষমতা বলে প্রদত্ত <strong>"তালাক-ই-তৌফিজ" (Talaq-e-Tawfeez)</strong> অথবা পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে <strong>"খোলা" (Khula)</strong> তালাকের মাধ্যমে একজন স্ত্রী সম্পূর্ণ আইনসম্মতভাবে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। স্ত্রী কর্তৃক ডিভোর্স নোটিশ পাঠানোর সঠিক পদ্ধতি, ৯০ দিনের সময়সীমা এবং দেনমোহর সংক্রান্ত আসল সত্য নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। বিশেষ আইনি নির্দেশনায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
মুসলিম বিবাহ আইনে বিবাহ বিচ্ছেদের মূল অধিকার স্বামীর হাতে ন্যস্ত থাকলেও ইসলাম নারীকে কখনোই পরাধীন বা বন্দি করে রাখার অনুমোদন দেয়নি। স্বামী যদি দায়িত্বজ্ঞানহীন, অত্যাচারী বা নীতিভ্রষ্ট হন, তবে স্ত্রীর জন্য বিচ্ছেদের স্পষ্ট অধিকার রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961)-এর ৮ ধারা এবং ১৮৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইনের আওতায় একজন স্ত্রী সম্পূর্ণ আইনি ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সাথে স্বামীকে তালাক প্রদান করতে পারেন। এতে স্ত্রীর সম্মানহানির কোনো সুযোগ নেই; এটি তার সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার।
বাংলাদেশ সরকারের স্ট্যান্ডার্ড মুসলিম নিকাহনামা বা কাবিননামার মোট ২৫টি কলাম থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কলামটি হলো ১৮ নম্বর কলাম। এই কলামের শিরোনাম হলো: "স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিবার কোনো ক্ষমতা অর্পণ করিয়াছে কিনা? করিয়া থাকিলে কি কি শর্তে?"
বিয়ের সময় যদি এই কলামে "হ্যাঁ" বা "শর্তহীনভাবে অত্র ক্ষমতা অর্পণ করা হইল" লেখা থাকে, তবে তাকে ইসলামিক আইনে "তালাক-ই-তৌফিজ" (Delegated Divorce) বলা হয়। এর অর্থ হলো, স্বামী বিয়ের সময়ই স্বেচ্ছায় নিজের তালাক দেওয়ার অধিকারটি স্ত্রীর হাতে অর্পণ করে দিয়েছেন। এই ক্ষমতা থাকলে স্ত্রী কোনো আদালতে না গিয়ে, কোনো কারণ না দেখিয়ে কেবল কাজী অফিসে গিয়েই স্বামীকে একতরফা তালাক প্রদান করতে পারেন।
অনেক সময় বিয়ের সময় কাজীর অবহেলায় বা বরের পরিবারের চালাকিতে ১৮ নম্বর কলাম ফাঁকা রাখা হয় বা কেটে দেওয়া হয়। ১৮ নম্বর কলাম না থাকলে স্ত্রী কি স্বামীকে তালাক দিতে পারবেন না? উত্তর হলো—অবশ্যই পারবেন।
সেক্ষেত্রে স্ত্রীর সামনে দুটি আইনানুগ পথ খোলা থাকে:
আমাদের সমাজে সিংহভাগ মানুষ এমনকি অনেক তথাকথিত শিক্ষিত মানুষও বিশ্বাস করেন যে—"মেয়ে যদি নিজে সেধে ডিভোর্স দেয়, তবে সে দেনমোহরের এক পয়সাও পাবে না, দেনমোহর মাফ হয়ে যাবে!"
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের শত শত রায় এবং সংবিধিবদ্ধ আইন অত্যন্ত পরিষ্কার: কাবিনের ১৮ নম্বর কলামে অর্পিত ক্ষমতা বলে (তালাক-ই-তৌফিজ) স্ত্রী নিজে স্বামীকে তালাক দিলেও তার সম্পূর্ণ কাবিনের দেনমোহরের টাকা শতভাগ বহাল থাকে। স্ত্রী নিজে তালাক দিয়েছেন এই অজুহাতে স্বামী দেনমোহরের এক পয়সাও কাটতে পারবেন না। দেনমোহর হলো বিবাহের বিনিময়মূল্য যা বিয়ের মুহূর্তেই স্ত্রীর চিরস্থায়ী অধিকার হয়েছে। একমাত্র স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় খোলা তালাকের শর্তে দেনমোহর মওকুফ করেন, কেবল তখনই দেনমোহর ছাড় হতে পারে; অন্যথায় স্ত্রী সম্পূর্ণ টাকা আইনত নগদে বুঝে পাবেন।
স্ত্রী যদি স্বামীকে তালাক দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন, তবে তার করণীয় পদক্ষেপসমূহ:
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(১) ও ৮ ধারা অনুযায়ী তালাক রেজিস্ট্রেশনের পর নোটিশ প্রেরণ হলো সবচেয়ে বাধ্যতামূলক শর্ত।
স্ত্রীকে একসাথে দুটি ঠিকানায় রেজিস্ট্রি ডাকযোগে প্রাপ্তিস্বীকার পত্রসহ (Registered Post with A/D) লিখিত নোটিশ পাঠাতে হবে:
ডাকঘরের মূল রসিদ ও ট্র্যাকিং কপি যত্ন করে সংরক্ষণ করতে হবে, কারণ এগুলোই তালাক কার্যকর হওয়ার প্রধান আইনগত প্রমাণ।
চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষকে নিয়ে সালিশি পরিষদ (Arbitration Council) গঠনের উদ্দেশ্যে নোটিশ জারি করবেন। চেয়ারম্যানের সালিশে যদি উভয় পক্ষ উপস্থিত হয়ে আপস করে ফেলে, তবে তালাক প্রত্যাহার হয়ে যাবে। আর যদি স্বামী উপস্থিত না হন বা আপস না মানেন, তবে সালিশি প্রক্রিয়া ব্যর্থ ঘোষণা করা হবে এবং আইন তার নিজস্ব গতিতে কার্যকর হবে।
চেয়ারম্যানের টেবিলে নোটিশ পৌঁছানোর তারিখ থেকে ঠিক ৯০ (নব্বই) দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনগতভাবে চূড়ান্ত কার্যকর (Legally Effective) হয়ে যাবে।
৯০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর কাজী অফিস বা ইউনিয়ন পরিষদ/কাউন্সিলর অফিস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে "তালাক কার্যকরের প্রত্যয়নপত্র" (Divorce Certificate) সংগ্রহ করতে হবে। এরপর স্ত্রী সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নতুন বিবাহে আবদ্ধ হতে পারবেন।
তালাক নোটিশ পাঠানোর সাথে সাথেই স্বামীর ওপর দেনমোহর ও খোরপোষ পরিশোধের আইনগত দায়িত্ব চাপে। স্বামী যদি স্বেচ্ছায় টাকা না দেন, তবে স্ত্রী বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতে পারিবারিক মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন। আদালত স্বামীর সমস্ত ব্যাংক একাউন্ট ও স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করে স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর ও ৯০ দিনের ইদ্দতকালীন খোরপোষের টাকা পাই পাই করে আদায় করে দেবেন।
তালাকের পর সন্তানের হেফাজত নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। মুসলিম আইন অনুযায়ী পুত্র সন্তান ৭ বছর বয়স পর্যন্ত এবং কন্যা সন্তান বয়ঃসন্ধি বা বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত মায়ের হেফাজতে (Hizanat) থাকার অধিকারী। আর সন্তান মায়ের কাছে থাকুক বা যেখানেই থাকুক, সন্তানের যাবতীয় খাবার, চিকিৎসা ও পড়াশোনার পূর্ণ খরচ পিতা বহন করতে আইনত বাধ্য।
স্ত্রী কর্তৃক তালাক ও দেনমোহর সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের মাইলফলক সিদ্ধান্তসমূহ:
১. হেলেমা খাতুন বনাম মোঃ হোসেন (44 DLR): মহামান্য হাইকোর্ট বেঞ্চ পরিষ্কারভাবে রায় দেন যে, কাবিননামার ১৮ কলামের ক্ষমতা প্রয়োগ করে স্ত্রী নিজে তালাক দিলেও স্বামীর দেনমোহর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থেকে কোনো মুক্তি নেই; দেনমোহর মাফ হওয়ার ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
২. তাহমিনা বেগম বনাম আব্দুল মান্নান (51 DLR AD): আপিল বিভাগ রায় দেন যে, চেয়ারম্যানের নিকট নোটিশ পৌঁছানোর ৯০ দিন পার হলে তালাক চূড়ান্ত হয় এবং এরপর স্বামী বা তার পরিবার স্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো বৈবাহিক অধিকার দাবি করতে পারে না।
কোনো সংসারে যখন সম্মান ও ভালোবাসা নিঃশেষ হয়ে যায় এবং জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন আইনসম্মত বিচ্ছেদই একজন নারীর বাঁচার একমাত্র সম্মানজনক পথ। সমাজে মানুষের ভুল কথায় কান দিয়ে নিজের দেনমোহরের অধিকার ছেড়ে দেবেন না। একজন বিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর সহায়তা নিয়ে কাবিনের ১৮ কলাম যাচাই করুন, সঠিক আইনি ফরমেটে নোটিশ প্রেরণ করুন এবং ৯০ দিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আপনার আত্মমর্যাদা ও নতুন জীবনের অধিকার পুনরুদ্ধার করুন।
স্ত্রী আইনসম্মতভাবে তালাক নোটিশ জারি করার পর অনেক সময় দেখা যায় প্রতিহিংসাপরায়ণ স্বামী বা তার পরিবার ক্ষুব্ধ হয়ে স্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মিথ্যা চুরির মামলা (দণ্ডবিধি ৩৮০ ধারা), বিশ্বাসভঙ্গের মামলা (৪০৬ ধারা) বা অন্য পুরুষের সাথে পরকীয়ার ভুয়া অভিযোগ দায়ের করে। এই ধরনের অন্যায় হয়রানির শিকার হলে কোনো অবস্থাতেই ভীত হওয়ার কারণ নেই। তালাক নোটিশ, পোস্টাল রসিদ ও ট্র্যাকিং রিপোর্টের কপি সাথে রেখে স্থানীয় থানায় তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণ ডায়েরি (GD) দায়ের করে রাখুন। যদি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে সমন বা ওয়ারেন্ট আসে, তবে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে প্রথম দিনেই হাজির হয়ে বৈধ তালাকনামা প্রদর্শনপূর্বক জামিন গ্রহণ করুন এবং পরবর্তীতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ক ধারায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে পিটিশন দায়ের করে মিথ্যা মামলাটি বাতিল (Quashment) করিয়ে নিন। আদালত অবমাননাকর বা বানোয়াট মামলা দায়েরের জন্য স্বামীর বিরুদ্ধে উল্টো ক্ষতিপূরণের মামলা করা সম্ভব।