স্বামী খোরপোষ ও ভরণপোষণ না দিলে স্ত্রী কী করবে? পারিবারিক আদালতে মামলা ও দেনমোহর আদায় ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06 · ১৬ মিনিট

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

<p>দাম্পত্য জীবনে বিবাদ বা অমিল দেখা দিলে আমাদের সমাজে অনেক স্বামী স্ত্রীকে আর্থিক ও মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়ার সবচেয়ে নির্মম কৌশল হিসেবে স্ত্রীর দৈনন্দিন খাবার, বাসস্থান, পোশাক ও চিকিৎসার খরচ বন্ধ করে দেন। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীকে জোর করে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে মাসের পর মাস কোনো খোঁজখবর নেন না এবং নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ পর্যন্ত বন্ধ করে দেন। নিরুপায় ও সন্তানসম্ভবা নারীরা তখন অসহায় বোধ করেন এবং লোকলজ্জার ভয়ে নীরবে চোখের জল ফেলেন। কিন্তু মুসলিম শরিয়া ও বাংলাদেশ সংবিধিবদ্ধ আইন অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছে—<strong>বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় স্ত্রীকে উপযুক্ত ভরণপোষণ (খোরপোষ) দেওয়া স্বামীর ওপর একটি বাধ্যতামূলক ও নিরঙ্কুশ আইনগত দায়িত্ব।</strong> স্ত্রী যদি ধনী পরিবারের সন্তানও হন, তবুও স্বামী তার ভরণপোষণ বন্ধ করার কোনো অধিকার রাখেন না। পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ (সংশোধিত) অনুযায়ী কীভাবে আদালতে মামলা করবেন, বিগত ৩ বছরের বকেয়া খোরপোষ ও ভবিষ্যৎ মাসিক খোরপোষ কীভাবে আদায় করবেন এবং স্বামী টাকা না দিলে কীভাবে তাকে দেওয়ানি কারাগারে পাঠাবেন—তার নিখুঁত আইনি রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো। আইনি পরামর্শে: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>

: · পারিবারিক ও বিবাহ আইনজীবী ঢাকা

এক নজরে মূল তথ্য (Quick Answer Table)

বিষয় / শর্তসরকারি নিয়ম, ফি ও আইন (২০২৬)
প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালামুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন ১৯৭৪ ও বিধিমালা ২০০৯ (সংশোধিত)
প্রথম ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দেনমোহরপ্রতি ১,০০০ টাকায় ১২.৫০ টাকা (অর্থাৎ প্রতি লাখে ১,২৫০ টাকা)
৪ লাখ টাকার অতিরিক্ত দেনমোহরপরবর্তী প্রতি ১ লাখ বা অংশবিশেষের জন্য মাত্র ১০০ টাকা
সর্বনিম্ন সরকারি নিবন্ধন ফি২০০ টাকা (দেনমোহর কম হলেও সর্বনিম্ন ২০০ টাকা প্রযোজ্য)
রসিদ ও সনদ যাচাইকাজী অফিসের সরকারি রসিদ বহি ও নিবন্ধিত নিকাহনামা (ফরম-ডি)
⚡ স্বামী খোরপোষ না দিলে করণীয় — একনজরে মূল আইনি তথ্য
  • মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় স্ত্রীকে উপযুক্ত বাসস্থান, অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসা প্রদান করা স্বামীর পরম আইনগত বাধ্যবাধকতা।
  • স্বামী স্বেচ্ছায় ভরণপোষণ না দিলে স্ত্রী পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ অনুযায়ী বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতে মাসিক খোরপোষ ও বকেয়া খোরপোষ আদায়ের মামলা দায়ের করতে পারেন।
  • স্ত্রী বিগত ৩ বছরের অনাদায়ী বকেয়া খোরপোষ এককালীন আদায় করতে পারেন এবং মামলা চলাকালীন অন্তর্বর্তীকালীন মাসিক খোরপোষের আদেশ পেতে পারেন।
  • স্বামী যদি আদালতের খোরপোষের ডিক্রি অমান্য করেন বা টাকা পরিশোধ না করেন, তবে আদালত স্বামীর স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও নিলাম করতে পারেন এবং স্বামীকে দেওয়ানি কারাগারে আটক রাখার আদেশ দিতে পারেন।
  • সন্তান মায়ের কাছে থাকলে ছেলে সাবালক হওয়া পর্যন্ত এবং মেয়ে বিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত পিতার কাছ থেকে সম্পূর্ণ খরচ পাওয়ার আইনগত অধিকারী।
📋 সূচিপত্র
  1. ১. স্ত্রীর ভরণপোষণ (খোরপোষ) কী এবং এতে কী কী অধিকার অন্তর্ভুক্ত?
  2. ২. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৯ ধারা: সালিশি পরিষদে খোরপোষ আদায়
  3. ৩. পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩: পারিবারিক আদালতে মোকদ্দমা দায়েরের পদ্ধতি
  4. ৪. আদালতের এখতিয়ার: স্ত্রী কোথায় ও কোন আদালতে মামলা করবেন?
  5. ৫. মাসিক খোরপোষের পরিমাণ আদালত কীভাবে নির্ধারণ করেন? (আয়ের আনুপাতিক নিয়ম)
  6. ৬. বিগত ৩ বছরের বকেয়া খোরপোষ এককালীন আদায়ের আইনি বিধান
  7. ৭. মামলা চলাকালীন অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোষ (Interim Maintenance) পাওয়ার নিয়ম
  8. ৮. নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ: পিতার একক ও সার্বিক দায়িত্ব
  9. ৯. স্বামী খোরপোষের ডিক্রির টাকা পরিশোধ না করলে শাস্তি ও দেওয়ানি জেল
  10. ১০. স্ত্রী কখন আইনত খোরপোষ পাওয়ার অধিকার হারান? (ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি)
  11. ১১. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় ও নজির (DLR Reference)
  12. ১২. পারিবারিক আদালতে খোরপোষ মামলায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের চেকলিস্ট
  13. ১৩. অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর স্ট্র্যাটেজিক দিকনির্দেশনা

১. স্ত্রীর ভরণপোষণ (খোরপোষ) কী এবং এতে কী কী অধিকার অন্তর্ভুক্ত?

আরবিতে একে বলা হয় "নাফাকা" (Nafaqah) এবং ফারসিতে বলা হয় "খোরপোষ"। আইনগত সংজ্ঞায় খোরপোষ কেবল চাল-ডালের খরচ নয়; এটি একজন স্ত্রীর সামগ্রিক জীবনধারণের অপরিহার্য চাহিদা মেটানোর সমষ্টি।

আইন অনুযায়ী খোরপোষে নিম্নলিখিত ৪টি মৌলিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত:

  • উপযুক্ত খাবার (Food): স্ত্রীর জীবনধারণ ও স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর দৈনিক খাদ্য সরবরাহ।
  • বাসস্থান (Shelter): সম্মানজনক ও নিরাপদ বসবাসের স্থান, যা স্বামীর পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
  • পোশাক-পরিচ্ছদ (Clothing): ঋতুভেদে পরিধানের উপযুক্ত শালীন পোশাক।
  • চিকিৎসা ও ওষুধপত্র (Medical Expenses): অসুস্থতায় যাবতীয় সুচিকিৎসা, ডাক্তারের ফি ও ওষুধের খরচ।

২. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৯ ধারা: সালিশি পরিষদে খোরপোষ আদায়

যদি কোনো স্বামী স্ত্রীকে পর্যাপ্ত খোরপোষ না দেন বা একাধিক স্ত্রী থাকলে তাদের সমভাবে ভরণপোষণ না করেন, তবে ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৯ ধারা অনুযায়ী স্ত্রী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের কাছে খোরপোষের সার্টিফিকেট চেয়ে আবেদন করতে পারেন। চেয়ারম্যান সালিশি পরিষদের মাধ্যমে খোরপোষের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেন। তবে চেয়ারম্যানের মাধ্যমে আদায় প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘায়িত ও অকার্যকর হওয়ায় সরাসরি পারিবারিক আদালতে যাওয়াই সবচেয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পথ।

৩. পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩: পারিবারিক আদালতে মোকদ্দমা দায়েরের পদ্ধতি

পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-কে যুগোপযোগী করে পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ বা পারিবারিক আদালতের বিচারকগণের হাতে খোরপোষ ও দেনমোহর আদায়ে বিপুল ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে।

মামলা দায়েরের নিয়মাবলী:

  1. নামমাত্র কোর্ট ফি: এই মামলায় সাধারণ দেওয়ানি মামলার মতো চড়া কোর্ট ফি লাগে না; মাত্র ৫০ থেকে ২০০ টাকার ফিক্সড কোর্ট ফি দিয়ে মামলা দাখিল করা যায়।
  2. সমন জারি: আরজি দাখিলের পর আদালত বিবাদী স্বামীর প্রতি দ্রুত রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এবং সমন বাহকের মাধ্যমে সমন প্রেরণ করেন।
  3. উভয় পক্ষের জবাব ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR): বিবাদী হাজির হয়ে লিখিত জবাব (Written Statement) দাখিলের পর আদালত প্রথমে উভয় পক্ষকে নিয়ে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
  4. বিচার ও ডিক্রি: আপস ব্যর্থ হলে আদালত বাদীর জবানবন্দি ও জেরা গ্রহণ করে চূড়ান্ত রায়ে মাসিক খোরপোষ ও বকেয়া টাকার ডিক্রি প্রচার করেন।

৪. আদালতের এখতিয়ার: স্ত্রী কোথায় ও কোন আদালতে মামলা করবেন?

অনেক স্বামী মনে করেন যেখানে তারা চাকরি করেন বা তাদের পৈতৃক বাড়ি, সেখানেই মামলা করতে হবে। কিন্তু পারিবারিক আদালত আইনের ধারা অনুযায়ী স্ত্রী যেখানে বর্তমানে বসবাস করছেন (এমনকি বাবার বাড়িতে হলেও) সেই এলাকার পারিবারিক আদালতে স্ত্রী সম্পূর্ণ এখতিয়ারসহ মামলা দায়ের করতে পারেন। স্ত্রীকে স্বামীর এলাকায় গিয়ে মামলা চালানোর কোনো প্রয়োজন নেই।

৫. মাসিক খোরপোষের পরিমাণ আদালত কীভাবে নির্ধারণ করেন? (আয়ের আনুপাতিক নিয়ম)

বিজ্ঞ আদালত স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য, মাসিক বেতন, ব্যবসা ও সামাজিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে খোরপোষ নির্ধারণ করেন।

স্বামীর মাসিক আয়/পেশা স্ত্রীর সম্ভাব্য মাসিক খোরপোষ নাবালক সন্তানের মাসিক বরাদ্দ
৩০,০০০ - ৫০,০০০ টাকা (বেসরকারি/ক্ষুদ্র ব্যবসা) ৮,০০০ - ১২,০০০ টাকা প্রতি সন্তানে ৫,০০০ - ৭,০০০ টাকা
৮০,০০০ - ১,৫০,০০০ টাকা (প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা/বড় ব্যবসা) ২০,০০০ - ৩৫,০০০ টাকা প্রতি সন্তানে ১২,০০০ - ২০,০০০ টাকা
প্রবাসী বা উচ্চ আয়ের ব্যবসায়ী ৪০,০০০ - ৭০,০০০+ টাকা সন্তানের স্কুলের মান ও জীবনযাত্রা অনুপাতে উপযুক্ত খরচ

৬. বিগত ৩ বছরের বকেয়া খোরপোষ এককালীন আদায়ের আইনি বিধান

তামাদি আইন ১৯০৮-এর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্বামী যতদিন যাবত স্ত্রীকে কোনো টাকা পয়সা না দিয়ে ফেলে রেখেছেন, স্ত্রী মামলা দায়েরের তারিখ থেকে পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ ৩ (তিন) বছরের অনাদায়ী বকেয়া খোরপোষ এককালীন আদায়ের ডিক্রি চাইতে পারেন। আদালত বিচারে প্রমাণ সাপেক্ষে এই বকেয়া অর্থ এককালীন পরিশোধের নির্দেশ দেন।

৭. মামলা চলাকালীন অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোষ (Interim Maintenance) পাওয়ার নিয়ম

মামলা নিষ্পত্তি হতে যদি কয়েক মাস সময় লেগে যায়, তবে স্ত্রী ততদিন না খেয়ে থাকবেন না। পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩-এর ১৬ক ধারা অনুযায়ী স্ত্রী মামলা দায়েরের পরপরই অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোষের (Interim Maintenance) দরখাস্ত দিতে পারেন। আদালত প্রাথমিক শুনানি ও স্বামীর আয়ের প্রাথমিক নথিপত্র দেখেই মামলা চলাকালীন প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোষ প্রদানের নির্দেশ দেন।

⚖️ আইনি কেস মূল্যায়ন ও চেম্বার অ্যাপয়েন্টমেন্ট

আপনার জমি বিরোধ, বাটোয়ারা মামলা, জামিন, তালাক বা সাইবার জটিলতায় বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে সুপ্রিম কোর্ট বা উত্তরা চেম্বারে নথিপত্রসহ সরাসরি বসুন।

জরুরি হোয়াটসঅ্যাপ সরাসরি কল: ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬

৮. নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ: পিতার একক ও সার্বিক দায়িত্ব

মা ও বাবার মধ্যে যত তিক্ততাই থাকুক না কেন, সন্তানের ভরণপোষণ বহন করার একক ও নিরঙ্কুশ আইনগত দায়িত্ব পিতার।

  • পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে: পুত্র প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছর) হওয়া পর্যন্ত সমস্ত খাবার, পোশাক ও লেখাপড়ার ব্যয় পিতাকে বহন করতে হবে।
  • কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে: কন্যা প্রাপ্তবয়স্ক হলেও বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তার আজীবন দায়িত্ব পিতার ওপর বর্তাবে।
  • পিতা পুনরায় বিয়ে করলেও পূর্বের ঘরের সন্তানদের ভরণপোষণ থেকে এক পয়সাও কমাতে পারবেন না।

৯. স্বামী খোরপোষের ডিক্রির টাকা পরিশোধ না করলে শাস্তি ও দেওয়ানি জেল

আদালতের রায়ের পর স্বামী যদি স্বেচ্ছাচারিতা করে ডিক্রির টাকা পরিশোধ না করেন, তবে পারিবারিক আদালত অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন:

⚖️ ডিক্রি জারির মাধ্যমে আদালত কর্তৃক প্রয়োগকৃত ব্যবস্থা

  • বেতন ও ব্যাংক একাউন্ট ক্রোক: স্বামীর নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বা ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়ে সরাসরি বেতন বা একাউন্ট থেকে টাকা কেটে স্ত্রীর অনুকূলে প্রদানের আদেশ।
  • স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও নিলাম: স্বামীর জমি, ফ্ল্যাট বা দোকান ক্রোক করে নিলামে বিক্রির মাধ্যমে ডিক্রির টাকা পরিশোধ।
  • দেওয়ানি কারাগারে প্রেরণ: অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার জন্য বিজ্ঞ আদালত স্বামীকে দেওয়ানি কারাগারে (Civil Imprisonment) আটক রাখার ওয়ারেন্ট জারি করেন।

১০. স্ত্রী কখন আইনত খোরপোষ পাওয়ার অধিকার হারান? (ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি)

আইনের চোখে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে স্ত্রী খোরপোষের অধিকার হারাতে পারেন:

  • কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া স্বামীর সাথে বসবাস করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানালে (নাশেজা বা অবাধ্য হলে)। তবে স্বামী যদি যৌতুকের জন্য মারধর করেন বা দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে আলাদা থাকা যুক্তিসঙ্গত বলে গণ্য হবে।
  • আইনসম্মত উপায়ে কার্যকর তালাকের পর ৯০ দিনের ইদ্দতকাল অতিক্রান্ত হয়ে গেলে (সন্তানের খরচ তখনো পিতা দিতে বাধ্য থাকবেন)।

১১. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় ও নজির (DLR Reference)

ভরণপোষণ সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তসমূহ:

১. হেলালউদ্দিন বনাম মাকসুদা বেগম (43 DLR): সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, স্বামীর আর্থিক দুরবস্থা বা বেকারত্ব কোনোভাবেই স্ত্রীর ভরণপোষণ মওকুফের কারণ হতে পারে না; স্বামীকে যেকোনো উপায়ে উপার্জন করে স্ত্রীর বেঁচে থাকার ন্যুনতম খরচ মেটাতে হবে।

২. রওশন আরা বনাম মোঃ ইয়াসিন (51 DLR): আদালত নিশ্চিত করেন যে, বাবার বাড়ি অবস্থানকালেও স্ত্রী যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি স্বামীর অত্যাচারের কারণে আশ্রয় নিয়েছেন, তবে বিগত সম্পূর্ণ সময়ের বকেয়া খোরপোষ পাওয়ার পূর্ণ অধিকারী হবেন।

১২. পারিবারিক আদালতে খোরপোষ মামলায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের চেকলিস্ট

পারিবারিক আদালতে মামলা করার পূর্বে নিচের নথিপত্রগুলো প্রস্তুত রাখুন:

  • ১. নিকাহনামা বা কাবিননামার সার্টিফাইড কপি।
  • ২. স্ত্রী ও সন্তানদের জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম সনদের কপি।
  • ৩. স্বামীর আয়ের দালিলিক প্রমাণ (যেমন: বেতন সার্টিফিকেট, ট্যাক্স রিটার্ন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ভিজিটিং কার্ড বা জমির দলিলের ফটোকপি)।
  • ৪. সন্তানদের স্কুলের বেতন রসিদ, টিউশন ও চিকিৎসার খরচের ভাউচার।
  • ৫. পূর্বে প্রেরিত উকিল নোটিশ বা থানায় করা কোনো জিডির কপি (যদি থাকে)।

১৩. অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর স্ট্র্যাটেজিক দিকনির্দেশনা

স্বামী ভরণপোষণ বন্ধ করে দিলে মনমরা হয়ে ঘরে বসে থাকবেন না। আইন আপনার পাশে রয়েছে। একজন অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর মাধ্যমে অবিলম্বে বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করুন এবং একই সাথে বিগত ৩ বছরের বকেয়া খোরপোষ ও বকেয়া দেনমোহর দাবি করুন। বিজ্ঞ আদালতের একটি কার্যকর আদেশ স্বামীকে দ্রুত দায়িত্ব পালনে বাধ্য করবে এবং আপনার ও আপনার সন্তানদের ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করবে।

১৪. খোরপোষ মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা ও বিদেশে পলায়ন রোধের আইনি কৌশল

অনেক স্বামী আদালতের মামলার কথা জানতে পারলে নিজের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গোপনে আত্মীয়-স্বজনের নামে লিখে দিয়ে বা বিক্রি করে নিজেকে নিঃস্ব দেখানোর অপচেষ্টা করেন। আবার প্রবাসী বা চতুর স্বামীরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন যাতে স্ত্রীর দেনমোহর ও খোরপোষের টাকা ফাঁকি দেওয়া যায়। এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতে বাদীর আইনজীবী দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮ ও ৩৯ ধারা এবং পারিবারিক আদালত আইনের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বলে স্বামীর দেশত্যাগের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban / Departure Prohibition) এবং তার স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ চাইতে পারেন। বিজ্ঞ আদালত সন্তুষ্ট হলে এসবির ইমিগ্রেশন শাখায় চিঠি পাঠিয়ে স্বামীর পাসপোর্ট লক করার আদেশ দিতে পারেন। এর ফলে স্বামী বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন না এবং আদালতে হাজির হয়ে স্ত্রীর দেনমোহর ও বকেয়া খোরপোষের টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হন। এই ধরনের সক্রিয় আইনি কৌশল নারীর অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

স্বামী ভরণপোষণ না দিলে কতদিনের মধ্যে মামলা করতে হয়?

স্ত্রী যেকোনো সময় পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন এবং মামলা দায়েরের তারিখ থেকে বিগত ৩ (তিন) বছরের বকেয়া খোরপোষ এককালীন আদায় করতে পারেন।

বাবার বাড়ি থাকলে কি স্ত্রী খোরপোষ পাওয়ার অধিকারী?

হ্যাঁ, স্বামীর নির্যাতন, দ্বিতীয় বিয়ে বা অন্যায়ের কারণে স্ত্রী যদি বাবার বাড়ি থাকতে বাধ্য হন, তবে তিনি পূর্ণ খোরপোষ পাওয়ার অধিকারী।

পারিবারিক আদালতে খোরপোষ মামলায় কি অনেক টাকা কোর্ট ফি লাগে?

না, পারিবারিক আদালত আইনে সাধারণ দেওয়ানি মামলার মতো মূল্যভিত্তিক কোর্ট ফি লাগে না; মাত্র নামমাত্র নির্ধারিত ফিক্সড ফি দিয়ে মামলা করা যায়।

স্বামী খোরপোষের টাকা না দিলে আদালত কী করতে পারেন?

আদালত স্বামীর বেতন বা ব্যাংক একাউন্ট ক্রোক করতে পারেন, স্বামীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিলাম করে টাকা আদায় করতে পারেন এবং স্বামীকে দেওয়ানি জেলে পাঠাতে পারেন।

তালাক হয়ে গেলে কি স্ত্রী আজীবন খোরপোষ পাবেন?

না, তালাক কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রী কেবল ৯০ দিনের ইদ্দতকালীন খোরপোষ ও বকেয়া দেনমোহর পান। তবে নাবালক সন্তানদের খরচ আজীবন পিতাকে বহন করতে হবে।

দায়বর্জন (Disclaimer): এই আর্টিকেলে পরিবেশিত তথ্যসমূহ কেবল আইনি সচেতনতা ও সাধারণ শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো প্রত্যক্ষ আইনি পরামর্শ (Legal Advice) নয় এবং এর মাধ্যমে কোনো আইনজীবী-মক্কেল সম্পর্ক (Attorney-Client Relationship) তৈরি হয় না। আপনার সুনির্দিষ্ট মামলার আইনি প্রতিকারের জন্য সরাসরি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বা জজ কোর্টের তালিকাভুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।
আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546  |  WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০