লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>দাম্পত্য জীবনে বিবাদ বা অমিল দেখা দিলে আমাদের সমাজে অনেক স্বামী স্ত্রীকে আর্থিক ও মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়ার সবচেয়ে নির্মম কৌশল হিসেবে স্ত্রীর দৈনন্দিন খাবার, বাসস্থান, পোশাক ও চিকিৎসার খরচ বন্ধ করে দেন। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীকে জোর করে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে মাসের পর মাস কোনো খোঁজখবর নেন না এবং নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ পর্যন্ত বন্ধ করে দেন। নিরুপায় ও সন্তানসম্ভবা নারীরা তখন অসহায় বোধ করেন এবং লোকলজ্জার ভয়ে নীরবে চোখের জল ফেলেন। কিন্তু মুসলিম শরিয়া ও বাংলাদেশ সংবিধিবদ্ধ আইন অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছে—<strong>বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় স্ত্রীকে উপযুক্ত ভরণপোষণ (খোরপোষ) দেওয়া স্বামীর ওপর একটি বাধ্যতামূলক ও নিরঙ্কুশ আইনগত দায়িত্ব।</strong> স্ত্রী যদি ধনী পরিবারের সন্তানও হন, তবুও স্বামী তার ভরণপোষণ বন্ধ করার কোনো অধিকার রাখেন না। পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ (সংশোধিত) অনুযায়ী কীভাবে আদালতে মামলা করবেন, বিগত ৩ বছরের বকেয়া খোরপোষ ও ভবিষ্যৎ মাসিক খোরপোষ কীভাবে আদায় করবেন এবং স্বামী টাকা না দিলে কীভাবে তাকে দেওয়ানি কারাগারে পাঠাবেন—তার নিখুঁত আইনি রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো। আইনি পরামর্শে: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
আরবিতে একে বলা হয় "নাফাকা" (Nafaqah) এবং ফারসিতে বলা হয় "খোরপোষ"। আইনগত সংজ্ঞায় খোরপোষ কেবল চাল-ডালের খরচ নয়; এটি একজন স্ত্রীর সামগ্রিক জীবনধারণের অপরিহার্য চাহিদা মেটানোর সমষ্টি।
আইন অনুযায়ী খোরপোষে নিম্নলিখিত ৪টি মৌলিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত:
যদি কোনো স্বামী স্ত্রীকে পর্যাপ্ত খোরপোষ না দেন বা একাধিক স্ত্রী থাকলে তাদের সমভাবে ভরণপোষণ না করেন, তবে ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৯ ধারা অনুযায়ী স্ত্রী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের কাছে খোরপোষের সার্টিফিকেট চেয়ে আবেদন করতে পারেন। চেয়ারম্যান সালিশি পরিষদের মাধ্যমে খোরপোষের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেন। তবে চেয়ারম্যানের মাধ্যমে আদায় প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘায়িত ও অকার্যকর হওয়ায় সরাসরি পারিবারিক আদালতে যাওয়াই সবচেয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পথ।
পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-কে যুগোপযোগী করে পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ বা পারিবারিক আদালতের বিচারকগণের হাতে খোরপোষ ও দেনমোহর আদায়ে বিপুল ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে।
মামলা দায়েরের নিয়মাবলী:
অনেক স্বামী মনে করেন যেখানে তারা চাকরি করেন বা তাদের পৈতৃক বাড়ি, সেখানেই মামলা করতে হবে। কিন্তু পারিবারিক আদালত আইনের ধারা অনুযায়ী স্ত্রী যেখানে বর্তমানে বসবাস করছেন (এমনকি বাবার বাড়িতে হলেও) সেই এলাকার পারিবারিক আদালতে স্ত্রী সম্পূর্ণ এখতিয়ারসহ মামলা দায়ের করতে পারেন। স্ত্রীকে স্বামীর এলাকায় গিয়ে মামলা চালানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
বিজ্ঞ আদালত স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য, মাসিক বেতন, ব্যবসা ও সামাজিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে খোরপোষ নির্ধারণ করেন।
| স্বামীর মাসিক আয়/পেশা | স্ত্রীর সম্ভাব্য মাসিক খোরপোষ | নাবালক সন্তানের মাসিক বরাদ্দ |
|---|---|---|
| ৩০,০০০ - ৫০,০০০ টাকা (বেসরকারি/ক্ষুদ্র ব্যবসা) | ৮,০০০ - ১২,০০০ টাকা | প্রতি সন্তানে ৫,০০০ - ৭,০০০ টাকা |
| ৮০,০০০ - ১,৫০,০০০ টাকা (প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা/বড় ব্যবসা) | ২০,০০০ - ৩৫,০০০ টাকা | প্রতি সন্তানে ১২,০০০ - ২০,০০০ টাকা |
| প্রবাসী বা উচ্চ আয়ের ব্যবসায়ী | ৪০,০০০ - ৭০,০০০+ টাকা | সন্তানের স্কুলের মান ও জীবনযাত্রা অনুপাতে উপযুক্ত খরচ |
তামাদি আইন ১৯০৮-এর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্বামী যতদিন যাবত স্ত্রীকে কোনো টাকা পয়সা না দিয়ে ফেলে রেখেছেন, স্ত্রী মামলা দায়েরের তারিখ থেকে পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ ৩ (তিন) বছরের অনাদায়ী বকেয়া খোরপোষ এককালীন আদায়ের ডিক্রি চাইতে পারেন। আদালত বিচারে প্রমাণ সাপেক্ষে এই বকেয়া অর্থ এককালীন পরিশোধের নির্দেশ দেন।
মামলা নিষ্পত্তি হতে যদি কয়েক মাস সময় লেগে যায়, তবে স্ত্রী ততদিন না খেয়ে থাকবেন না। পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩-এর ১৬ক ধারা অনুযায়ী স্ত্রী মামলা দায়েরের পরপরই অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোষের (Interim Maintenance) দরখাস্ত দিতে পারেন। আদালত প্রাথমিক শুনানি ও স্বামীর আয়ের প্রাথমিক নথিপত্র দেখেই মামলা চলাকালীন প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোষ প্রদানের নির্দেশ দেন।
মা ও বাবার মধ্যে যত তিক্ততাই থাকুক না কেন, সন্তানের ভরণপোষণ বহন করার একক ও নিরঙ্কুশ আইনগত দায়িত্ব পিতার।
আদালতের রায়ের পর স্বামী যদি স্বেচ্ছাচারিতা করে ডিক্রির টাকা পরিশোধ না করেন, তবে পারিবারিক আদালত অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন:
আইনের চোখে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে স্ত্রী খোরপোষের অধিকার হারাতে পারেন:
ভরণপোষণ সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তসমূহ:
১. হেলালউদ্দিন বনাম মাকসুদা বেগম (43 DLR): সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, স্বামীর আর্থিক দুরবস্থা বা বেকারত্ব কোনোভাবেই স্ত্রীর ভরণপোষণ মওকুফের কারণ হতে পারে না; স্বামীকে যেকোনো উপায়ে উপার্জন করে স্ত্রীর বেঁচে থাকার ন্যুনতম খরচ মেটাতে হবে।
২. রওশন আরা বনাম মোঃ ইয়াসিন (51 DLR): আদালত নিশ্চিত করেন যে, বাবার বাড়ি অবস্থানকালেও স্ত্রী যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি স্বামীর অত্যাচারের কারণে আশ্রয় নিয়েছেন, তবে বিগত সম্পূর্ণ সময়ের বকেয়া খোরপোষ পাওয়ার পূর্ণ অধিকারী হবেন।
পারিবারিক আদালতে মামলা করার পূর্বে নিচের নথিপত্রগুলো প্রস্তুত রাখুন:
স্বামী ভরণপোষণ বন্ধ করে দিলে মনমরা হয়ে ঘরে বসে থাকবেন না। আইন আপনার পাশে রয়েছে। একজন অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর মাধ্যমে অবিলম্বে বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করুন এবং একই সাথে বিগত ৩ বছরের বকেয়া খোরপোষ ও বকেয়া দেনমোহর দাবি করুন। বিজ্ঞ আদালতের একটি কার্যকর আদেশ স্বামীকে দ্রুত দায়িত্ব পালনে বাধ্য করবে এবং আপনার ও আপনার সন্তানদের ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করবে।
অনেক স্বামী আদালতের মামলার কথা জানতে পারলে নিজের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গোপনে আত্মীয়-স্বজনের নামে লিখে দিয়ে বা বিক্রি করে নিজেকে নিঃস্ব দেখানোর অপচেষ্টা করেন। আবার প্রবাসী বা চতুর স্বামীরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন যাতে স্ত্রীর দেনমোহর ও খোরপোষের টাকা ফাঁকি দেওয়া যায়। এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতে বাদীর আইনজীবী দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮ ও ৩৯ ধারা এবং পারিবারিক আদালত আইনের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বলে স্বামীর দেশত্যাগের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban / Departure Prohibition) এবং তার স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ চাইতে পারেন। বিজ্ঞ আদালত সন্তুষ্ট হলে এসবির ইমিগ্রেশন শাখায় চিঠি পাঠিয়ে স্বামীর পাসপোর্ট লক করার আদেশ দিতে পারেন। এর ফলে স্বামী বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন না এবং আদালতে হাজির হয়ে স্ত্রীর দেনমোহর ও বকেয়া খোরপোষের টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হন। এই ধরনের সক্রিয় আইনি কৌশল নারীর অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে।