স্বামী বা স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সঠিক আইনি নিয়ম ও নোটিশ পাঠানোর ৫টি ধাপ ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-21 · ১৮ মিনিট

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বৈবাহিক জীবনের তিক্ততা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায় এবং আপোসের কোনো পথ খোলা থাকে না, তখন আইনিভাবে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক সম্পন্ন করা অনিবার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু অনেকেই মুখে তিন তালাক দেওয়া বা কেবল কোর্ট এফিডেভিট করে নোটিশ ছাড়া তালাক দাবি করেন—যা বাংলাদেশের আইনে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ (MFLO 1961)-এর ৭ ও ৮ ধারা অনুযায়ী কীভাবে স্বামী বা স্ত্রী আইনসম্মত উপায়ে তালাক দেবেন, চেয়ারম্যানকে কীভাবে নোটিশ পাঠাবেন এবং দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন খোরপোষের নিষ্পত্তির নিয়ম নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞ <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold;text-decoration:underline;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা নিচে আলোচনা করা হলো। জরুরি পারিবারিক আইনি পরামর্শে কল করুন: <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold;">০১৭১২-৬৫৫৫৪৬</a>।

⚡ এক নজরে: তালাক নোটিশ ও কার্যকর হওয়ার আইনি বিধান
  • তালাক ঘোষণার পর চেয়ারম্যান/মেয়র এবং অপর পক্ষকে লিখিত রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ পাঠানো আইনত বাধ্যতামূলক।
  • নোটিশ চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছানোর তারিখ থেকে ঠিক ৯০ (নব্বই) দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তালাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়।
  • স্ত্রীকে তালাক দিলেও তার সম্পূর্ণ দেনমোহর (Mahr) এবং ৯০ দিনের ইদ্দতকালীন খোরপোষ পরিশোধ করা স্বামীর বাধ্যতামূলক দায়।
  • নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলামে ক্ষমতা দেওয়া থাকলে স্ত্রী স্বামীকে একতরফা 'তালাক-ই-তাওফিজ' দিতে পারেন। ক্ষমতা না থাকলে পারিবারিক আদালতে খোলা বা ফাসখ তালাকের মামলা করতে হয়।
  • চেয়ারম্যানকে নোটিশ না দিয়ে তালাক দিলে বা গোপন রাখলে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।
📋 সূচিপত্র
  1. ১. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী তালাকের প্রকারভেদ
  2. ২. স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক দেওয়ার নিয়ম (তালাক-ই-তাওফিজ)
  3. ৩. স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সঠিক আইনি ধাপসমূহ
  4. ৪. ইউনিয়ন পরিষদ / সিটি কর্পোরেশন মেয়রের কাছে নোটিশ পাঠানোর নিয়ম
  5. ৫. ৯০ দিনের শালিসি বৈঠক (Arbitration Council) ও আপোসের সুযোগ
  6. ৬. তালাকের পর দেনমোহর ও খোরপোষ আদায়ের আইনি অধিকার
  7. ৭. সন্তানের কাস্টডি (হেফাজত) ও খরচ বহনের বাধ্যবাধকতা
  8. ৮. অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর আইনি পরামর্শ

১. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী তালাকের প্রকারভেদ

বাংলাদেশে মুসলিম আইনে মূলত ৩ উপায়ে বিবাহবিচ্ছেদ হতে পারে:

  • তালাক (Talaq by Husband): স্বামীর নিজস্ব একক অধিকার বলে স্ত্রীকে তালাক প্রদান।
  • তালাক-ই-তাওফিজ (Talaq-e-Tawfeez by Wife): বিয়ের সময় কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে স্ত্রীর মাধ্যমে তালাক গ্রহণ।
  • খোলা বা মুবারাত (Khula / Mutual Divorce): স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক সমঝোতা বা আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ।

পদ্ধতি যাই হোক না কেন, ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৭ ধারা অনুযায়ী নোটিশ না পাঠালে আইনের দৃষ্টিতে তালাক কখনোই কার্যকর হবে না।

২. স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক দেওয়ার নিয়ম (তালাক-ই-তাওফিজ)

স্ত্রী যদি স্বামীকে তালাক দিতে চান, তবে প্রথমেই নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলাম পরীক্ষা করতে হবে। সেখানে যদি লেখা থাকে—'হ্যাঁ, স্বামী স্ত্রীকে শর্তহীনভাবে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করিলেন', তবে স্ত্রী নিজে স্বামীকে সরাসরি তালাক নোটিশ পাঠাতে পারেন।

যদি ১৮ নম্বর কলাম খালি থাকে: যদি কাবিননামায় স্ত্রীকে ক্ষমতা না দেওয়া থাকে, তবে স্ত্রী একতরফা তালাক নোটিশ পাঠাতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকার পারিবারিক আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা (Suit for Dissolution of Marriage) দায়ের করতে হবে। মানসিক নির্যাতন, খোরপোষ না দেওয়া বা নিরুদ্দেশ থাকার প্রমাণ দিয়ে আদালত থেকে ডিক্রি নিতে হবে।

৩. স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সঠিক আইনি ধাপসমূহ

স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে নিচের ৫টি ধাপ নিখুঁতভাবে অনুসরণ করতে হবে:

  1. তালাক উচ্চারণ ও লিগ্যাল নোটিশ ড্রাফটিং: একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে ৩টি তালাকের ঘোষণা ও কারণ উল্লেখ করে সুস্পষ্ট তালাকনামা প্রস্তুত করা।
  2. কাজী অফিসে এন্ট্রি: সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারের ভলিউমে তালাকের বিবরণ নিবন্ধন করা।
  3. চেয়ারম্যান বরাবরে ডাকযোগে প্রেরণ: স্ত্রী যে এলাকায় স্থায়ী বা বর্তমানে বসবাস করছেন, সেই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভা মেয়র অথবা সিটি কর্পোরেশনের জোনাল এক্সিকিউটিভ অফিসার বরাবর রেজিস্ট্রি ডাকযোগে (AD সহ) নোটিশ পাঠানো।
  4. স্ত্রীর বরাবরে নোটিশের অনুলিপি প্রেরণ: নোটিশের মূল কপির একটি হুবহু কপি স্ত্রীর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানায় ডাকযোগে প্রেরণ করা।
  5. ৯০ দিনের নোটিশ মেয়াদ গণনা: ডাক রসিদ ও প্রাপ্তি স্বীকারপত্র অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা।

৪. ইউনিয়ন পরিষদ / সিটি কর্পোরেশন মেয়রের কাছে নোটিশ পাঠানোর নিয়ম

চেয়ারম্যান বা মেয়রের দফতরে নোটিশ পৌঁছানোই তালাক কার্যকর হওয়ার আইনি সময়সীমা নির্ধারণ করে। নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি শালিসি পরিষদ (Arbitration Council) গঠন করবেন এবং পুনর্মিলন বা আপোসের চেষ্টা করার জন্য উভয় পক্ষকে পরপর ৩টি নোটিশ পাঠাবেন।

উভয় পক্ষ আপোস করতে ব্যর্থ হলে অথবা কোনো পক্ষ হাজির না হলে নোটিশ প্রাপ্তির দিন থেকে ঠিক ৯০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর তালাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে। চেয়ারম্যান তখন একটি তালাক প্রত্যয়নপত্র বা নো-রিকনসিলিয়েশন সার্টিফিকেট প্রদান করেন।

৫. ৯০ দিনের শালিসি বৈঠক (Arbitration Council) ও আপোসের সুযোগ

এই ৯০ দিনের সময়কে ইসলামে 'ইদ্দতকাল' বলা হয়। এই ৯০ দিনের মধ্যে স্বামী বা স্ত্রী চাইলে যেকোনো সময় তালাক প্রত্যাহার (Revoke) করে সংসারে ফিরে যেতে পারেন। প্রত্যাহার করতে চাইলে লিখিতভাবে চেয়ারম্যান ও অপর পক্ষকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিলেই তালাক বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু ৯০ দিন পার হয়ে গেলে তালাক চূড়ান্ত হয়ে যায় এবং পুনরায় সংসার করতে হলে নতুন করে বিয়ে করতে হবে।

৬. তালাকের পর দেনমোহর ও খোরপোষ আদায়ের আইনি অধিকার

অনেকে মনে করেন স্ত্রী তালাক দিলে দেনমোহর পাওয়া যায় না। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। স্ত্রী তালাক দিক বা স্বামী তালাক দিক—স্ত্রীর সম্পূর্ণ বকেয়া দেনমোহর (Prompt & Deferred Mahr) পরিশোধ করা স্বামীর জন্য আইনিভাবে বাধ্যতামূলক।

তাছাড়া তালাক কার্যকর হওয়া পর্যন্ত ৯০ দিনের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের খোরপোষ (Maintenance) স্বামীকে দিতে হবে। স্বামী দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে দেনমোহর আদায়ের মামলা করে স্বামীর সম্পত্তি ক্রোক ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করাতে পারেন।

৭. সন্তানের কাস্টডি (হেফাজত) ও খরচ বহনের বাধ্যবাধকতা

তালাক হলেও সন্তানের প্রতি বাবার আর্থিক দায়িত্ব কখনো শেষ হয় না। সন্তানের থাকা-খাওয়া, পড়াশোনা ও চিকিৎসার সমস্ত খরচ বাবাকে বহন করতে হবে। মুসলিম আইন অনুযায়ী ছেলে সন্তান ৭ বছর এবং মেয়ে সন্তান বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকবে। অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ হলে পারিবারিক আদালতে কাস্টডি মামলা দায়ের করতে হয়।

৮. অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর পরামর্শ

তালাকের আইনি প্রক্রিয়া সামান্যতম ত্রুটিপূর্ণ হলে পরবর্তীকালে দ্বিতীয় বিবাহ করলে তা দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী দ্বিবিবাহ (Bigamy)-এর ফৌজদারি অপরাধে রূপ নিতে পারে। তাই নোটিশ পাঠানো থেকে শুরু করে কার্যকর সার্টিফিকেট তোলা পর্যন্ত একজন দক্ষ পারিবারিক আইনজীবীর মাধ্যমে সম্পন্ন করা নিরাপদ। আমাদের চেম্বারে সম্পূর্ণ আইনগত নিশ্চয়তায় তালাক ও পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

স্ত্রী তালাক দিলে কি দেনমোহরের টাকা স্বামীকে দিতে হবে?

হ্যাঁ, কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতাবলে স্ত্রী তালাক দিলেও তার সম্পূর্ণ দেনমোহরের টাকা স্বামী পরিশোধ করতে বাধ্য। তবে স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় দেনমোহর মাফ করে দিয়ে আপোস বিচ্ছেদ (খোলা তালাক) করেন, কেবল তখনই দেনমোহর দাবি করা যায় না।

মুখে মুখে ৩ তালাক দিলে কি আইন অনুযায়ী তালাক কার্যকর হয়?

না। বাংলাদেশের ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যানকে নোটিশ না দিয়ে কেবল মৌখিক তালাক দিলে তা আইনত অকার্যকর থাকে এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বহাল থাকে।

তালাকের নোটিশ স্ত্রী রিসিভ না করে ফেরত পাঠালে কি তালাক হবে?

হ্যাঁ, হবে। সুপ্রিম কোর্টের নজির অনুযায়ী রেজিস্ট্রি ডাকযোগে সঠিক ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হলে এবং প্রাপক তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে বা ফেরত আসলে, তা 'আইনসম্মতভাবে জারি হয়েছে' (Deemed Service) বলেই গণ্য হবে এবং ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে।

তালাক কার্যকর হওয়ার পর কি আবার একই স্ত্রীর সাথে বিয়ে করা যায়?

হ্যাঁ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(৬) ধারা অনুযায়ী কোনো হিল্লা বিয়ের শর্ত ছাড়াই সাধারণ নিয়মে পুনরায় নতুন দেনমোহর ধার্য করে কাজী অফিসে তাদের মধ্যে আবার বিবাহ বন্ধন সম্ভব।

আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546  |  WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০