লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-21 · ১৮ মিনিট
বৈবাহিক জীবনের তিক্ততা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায় এবং আপোসের কোনো পথ খোলা থাকে না, তখন আইনিভাবে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক সম্পন্ন করা অনিবার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু অনেকেই মুখে তিন তালাক দেওয়া বা কেবল কোর্ট এফিডেভিট করে নোটিশ ছাড়া তালাক দাবি করেন—যা বাংলাদেশের আইনে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ (MFLO 1961)-এর ৭ ও ৮ ধারা অনুযায়ী কীভাবে স্বামী বা স্ত্রী আইনসম্মত উপায়ে তালাক দেবেন, চেয়ারম্যানকে কীভাবে নোটিশ পাঠাবেন এবং দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন খোরপোষের নিষ্পত্তির নিয়ম নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞ <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold;text-decoration:underline;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা নিচে আলোচনা করা হলো। জরুরি পারিবারিক আইনি পরামর্শে কল করুন: <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold;">০১৭১২-৬৫৫৫৪৬</a>।
বাংলাদেশে মুসলিম আইনে মূলত ৩ উপায়ে বিবাহবিচ্ছেদ হতে পারে:
পদ্ধতি যাই হোক না কেন, ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৭ ধারা অনুযায়ী নোটিশ না পাঠালে আইনের দৃষ্টিতে তালাক কখনোই কার্যকর হবে না।
স্ত্রী যদি স্বামীকে তালাক দিতে চান, তবে প্রথমেই নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলাম পরীক্ষা করতে হবে। সেখানে যদি লেখা থাকে—'হ্যাঁ, স্বামী স্ত্রীকে শর্তহীনভাবে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করিলেন', তবে স্ত্রী নিজে স্বামীকে সরাসরি তালাক নোটিশ পাঠাতে পারেন।
যদি ১৮ নম্বর কলাম খালি থাকে: যদি কাবিননামায় স্ত্রীকে ক্ষমতা না দেওয়া থাকে, তবে স্ত্রী একতরফা তালাক নোটিশ পাঠাতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকার পারিবারিক আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা (Suit for Dissolution of Marriage) দায়ের করতে হবে। মানসিক নির্যাতন, খোরপোষ না দেওয়া বা নিরুদ্দেশ থাকার প্রমাণ দিয়ে আদালত থেকে ডিক্রি নিতে হবে।
স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে নিচের ৫টি ধাপ নিখুঁতভাবে অনুসরণ করতে হবে:
চেয়ারম্যান বা মেয়রের দফতরে নোটিশ পৌঁছানোই তালাক কার্যকর হওয়ার আইনি সময়সীমা নির্ধারণ করে। নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি শালিসি পরিষদ (Arbitration Council) গঠন করবেন এবং পুনর্মিলন বা আপোসের চেষ্টা করার জন্য উভয় পক্ষকে পরপর ৩টি নোটিশ পাঠাবেন।
উভয় পক্ষ আপোস করতে ব্যর্থ হলে অথবা কোনো পক্ষ হাজির না হলে নোটিশ প্রাপ্তির দিন থেকে ঠিক ৯০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর তালাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে। চেয়ারম্যান তখন একটি তালাক প্রত্যয়নপত্র বা নো-রিকনসিলিয়েশন সার্টিফিকেট প্রদান করেন।
এই ৯০ দিনের সময়কে ইসলামে 'ইদ্দতকাল' বলা হয়। এই ৯০ দিনের মধ্যে স্বামী বা স্ত্রী চাইলে যেকোনো সময় তালাক প্রত্যাহার (Revoke) করে সংসারে ফিরে যেতে পারেন। প্রত্যাহার করতে চাইলে লিখিতভাবে চেয়ারম্যান ও অপর পক্ষকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিলেই তালাক বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু ৯০ দিন পার হয়ে গেলে তালাক চূড়ান্ত হয়ে যায় এবং পুনরায় সংসার করতে হলে নতুন করে বিয়ে করতে হবে।
অনেকে মনে করেন স্ত্রী তালাক দিলে দেনমোহর পাওয়া যায় না। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। স্ত্রী তালাক দিক বা স্বামী তালাক দিক—স্ত্রীর সম্পূর্ণ বকেয়া দেনমোহর (Prompt & Deferred Mahr) পরিশোধ করা স্বামীর জন্য আইনিভাবে বাধ্যতামূলক।
তাছাড়া তালাক কার্যকর হওয়া পর্যন্ত ৯০ দিনের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের খোরপোষ (Maintenance) স্বামীকে দিতে হবে। স্বামী দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে দেনমোহর আদায়ের মামলা করে স্বামীর সম্পত্তি ক্রোক ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করাতে পারেন।
তালাক হলেও সন্তানের প্রতি বাবার আর্থিক দায়িত্ব কখনো শেষ হয় না। সন্তানের থাকা-খাওয়া, পড়াশোনা ও চিকিৎসার সমস্ত খরচ বাবাকে বহন করতে হবে। মুসলিম আইন অনুযায়ী ছেলে সন্তান ৭ বছর এবং মেয়ে সন্তান বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকবে। অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ হলে পারিবারিক আদালতে কাস্টডি মামলা দায়ের করতে হয়।
তালাকের আইনি প্রক্রিয়া সামান্যতম ত্রুটিপূর্ণ হলে পরবর্তীকালে দ্বিতীয় বিবাহ করলে তা দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী দ্বিবিবাহ (Bigamy)-এর ফৌজদারি অপরাধে রূপ নিতে পারে। তাই নোটিশ পাঠানো থেকে শুরু করে কার্যকর সার্টিফিকেট তোলা পর্যন্ত একজন দক্ষ পারিবারিক আইনজীবীর মাধ্যমে সম্পন্ন করা নিরাপদ। আমাদের চেম্বারে সম্পূর্ণ আইনগত নিশ্চয়তায় তালাক ও পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়।
হ্যাঁ, কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতাবলে স্ত্রী তালাক দিলেও তার সম্পূর্ণ দেনমোহরের টাকা স্বামী পরিশোধ করতে বাধ্য। তবে স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় দেনমোহর মাফ করে দিয়ে আপোস বিচ্ছেদ (খোলা তালাক) করেন, কেবল তখনই দেনমোহর দাবি করা যায় না।
না। বাংলাদেশের ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যানকে নোটিশ না দিয়ে কেবল মৌখিক তালাক দিলে তা আইনত অকার্যকর থাকে এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বহাল থাকে।
হ্যাঁ, হবে। সুপ্রিম কোর্টের নজির অনুযায়ী রেজিস্ট্রি ডাকযোগে সঠিক ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হলে এবং প্রাপক তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে বা ফেরত আসলে, তা 'আইনসম্মতভাবে জারি হয়েছে' (Deemed Service) বলেই গণ্য হবে এবং ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে।
হ্যাঁ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(৬) ধারা অনুযায়ী কোনো হিল্লা বিয়ের শর্ত ছাড়াই সাধারণ নিয়মে পুনরায় নতুন দেনমোহর ধার্য করে কাজী অফিসে তাদের মধ্যে আবার বিবাহ বন্ধন সম্ভব।