বাংলাদেশে তালাক দেওয়ার নিয়ম ও প্রক্রিয়া — মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী
লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-12
⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়।
সরাসরি পরামর্শের জন্য
+880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।
বাংলাদেশে তালাক একটি স্পর্শকাতর আইনি প্রক্রিয়া যা মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সঠিক নিয়ম না মানলে তালাক আইনগতভাবে কার্যকর হয় না এবং উভয় পক্ষ আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।
তালাক কী ও কত প্রকার
তালাক হলো মুসলিম আইনে স্বামী কর্তৃক বিবাহ বিচ্ছেদের পদ্ধতি। বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী তালাক তিন ধরনের:
- তালাক-ই-আহসান: সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি — এক তুহরে একটি তালাক দিয়ে ইদ্দত কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা
- তালাক-ই-হাসান: তিন তুহরে তিনটি তালাক দেওয়া, প্রতিটির মাঝে রজু করার সুযোগ থাকে
- তালাক-ই-বিদাত: একসাথে তিন তালাক — এটি অনুচিত তবে আইনত কার্যকর বলে গণ্য হয়
বাংলাদেশের আইনে যেকোনো পদ্ধতিতে তালাক দেওয়া হোক না কেন, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা পৌরসভা মেয়রকে নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক। নোটিশ ছাড়া তালাক আইনগতভাবে সম্পূর্ণ হয় না।
তালাক দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে
বাংলাদেশে তালাকের সঠিক আইনি প্রক্রিয়া নিচে দেওয়া হলো:
- তালাক উচ্চারণ বা লিখিত ঘোষণা: স্বামী মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে তালাক দেন।
- চেয়ারম্যান/মেয়রকে নোটিশ: তালাকের ৩০ দিনের মধ্যে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা পৌরসভার মেয়রকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে। নোটিশে তালাকের কারণ ও তারিখ উল্লেখ থাকতে হবে।
- স্ত্রীকে নোটিশ পাঠানো: একই নোটিশের কপি স্ত্রীর কাছে পাঠাতে হবে।
- সালিশি পরিষদ গঠন: চেয়ারম্যান উভয় পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে সালিশি পরিষদ গঠন করবেন এবং মীমাংসার চেষ্টা করবেন।
- ৯০ দিন অপেক্ষা: নোটিশ পাঠানোর তারিখ থেকে ৯০ দিন পর তালাক চূড়ান্ত হয়।
যদি এই প্রক্রিয়া মানা না হয়, তালাক দেওয়া ব্যক্তি এক বছর কারাদণ্ড বা ১০,০০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
নোটিশ পাঠানোর সঠিক নিয়ম
নোটিশ পাঠানো তালাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করুন:
- নোটিশ রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠান যাতে প্রমাণ থাকে
- নোটিশে স্বামী ও স্ত্রীর পূর্ণ নাম, ঠিকানা, বিবাহের তারিখ ও কাবিননামা নম্বর উল্লেখ করুন
- তালাকের কারণ সংক্ষেপে লিখুন
- নোটিশের তারিখ পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করুন
- চেয়ারম্যান অফিস থেকে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র সংগ্রহ করুন
সতর্কতা: যদি স্ত্রী বিদেশে থাকেন বা ঠিকানা অজানা হয়, আইনজীবীর সাহায্য নিন — এই পরিস্থিতিতে বিশেষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
ইদ্দত কাল ও এর গুরুত্ব
ইদ্দত কাল হলো তালাকের পরে স্ত্রীর অপেক্ষা করার সময়। বাংলাদেশের আইনে:
- সাধারণত ৩ মাসিক ঋতুকাল বা ৯০ দিন ইদ্দত পালন করতে হয়
- গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত ইদ্দত চলে
- ইদ্দত কালে স্বামী রজু (ফিরে আসা) করতে পারেন
- ইদ্দত কালে স্ত্রী অন্যত্র বিবাহ করতে পারবেন না
ইদ্দত কালে স্বামী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। ইদ্দত শেষে তালাক চূড়ান্ত হয় এবং কাবিননামায় নির্ধারিত দেনমোহর পরিশোধ করতে হয়।
তালাকের পরে স্ত্রীর অধিকার
তালাকের পরে স্ত্রী নিম্নলিখিত অধিকার পান:
- দেনমোহর: কাবিননামায় নির্ধারিত দেনমোহর সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে
- ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ: তালাকের পরে ইদ্দত কাল পর্যন্ত ভরণপোষণ পাবেন
- সন্তানের হেফাজত: ছেলে ৭ বছর ও মেয়ে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকার অধিকার রাখে
- সম্পত্তির অধিকার: বিবাহকালীন উপহার ও নিজস্ব সম্পত্তি ফেরত পাবেন
স্বামী এই অধিকারগুলো না দিলে পারিবারিক আদালতে মামলা করা যায়।
আদালতি তালাক কখন প্রয়োজন
কিছু ক্ষেত্রে শুধু তালাক নোটিশ যথেষ্ট নয়, আদালতে যেতে হয়:
- স্বামী তালাক না দিতে চাইলে স্ত্রী খুলা বা বিচারিক তালাকের জন্য আদালতে আবেদন করতে পারেন
- দেনমোহর না পেলে পারিবারিক আদালতে মামলা করুন
- সন্তানের হেফাজত নিয়ে বিরোধ হলে আদালতের মাধ্যমে সমাধান নিন
- ইদ্দত কালের ভরণপোষণ না পেলে আইনি পদক্ষেপ নিন
পারিবারিক আইনের জটিল বিষয়ে অভিজ্ঞ ডিভোর্স আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
সাধারণ ভুল ও সতর্কতা
তালাকের সময় অনেকে যে ভুলগুলো করেন:
- নোটিশ না দিয়ে তালাক সম্পন্ন হয়েছে মনে করা — এটি আইনত অসম্পূর্ণ
- ৯০ দিন আগেই অন্য বিবাহ করা — এটি দ্বিবিবাহ আইনের অধীনে অপরাধ
- দেনমোহর না দিয়ে তালাক করা — স্ত্রী মামলা করতে পারবেন
- সন্তানের হেফাজত নিয়ে আলোচনা না করা
যেকোনো পারিবারিক আইনি বিষয়ে অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম-এর সাথে পরামর্শ করুন। উত্তরা, ঢাকায় চেম্বার।