বাংলাদেশে তালাক নামা প্রক্রিয়া ২০২৬ — কিভাবে তালাক নামা করবেন?

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-12

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশে তালাক একটি আইনি প্রক্রিয়া যা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করতে হয়। শুধু মুখে বললেই বা মোবাইলে বললেই তালাক হয় না — আইনি পদ্ধতি না মানলে তালাক আদালতে অকার্যকর হতে পারে। এই গাইডে জানুন সঠিক পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আপনার অধিকার।

তালাক কি এবং বাংলাদেশে তালাকের আইন

তালাক হলো বিবাহ বিচ্ছেদের ইসলামিক পদ্ধতি। বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ (MFLO) অনুযায়ী তালাক নিয়ন্ত্রিত হয়।

গুরুত্বপূর্ণ: মোবাইলে SMS, WhatsApp বা ফোনে দেওয়া তালাক আইনত দুর্বল। MFLO-র আওতায় সঠিক প্রক্রিয়া না মানলে তালাক বাতিল হতে পারে।

  • মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ (MFLO)
  • পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫
  • মুসলিম বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ নিবন্ধন আইন ১৯৭৪

যেকোনো তালাক সংক্রান্ত বিষয়ে ডিভোর্স আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

স্বামী কর্তৃক তালাক — তালাক-ই-তাফউয়িদ

মুসলিম আইনে স্বামীর তালাক দেওয়ার অধিকারকে তালাক বলা হয়। বাংলাদেশে MFLO ধারা ৭ অনুযায়ী প্রক্রিয়া হলো:

  1. লিখিত নোটিশ: স্বামীকে লিখিতভাবে তালাকের নোটিশ দিতে হবে
  2. চেয়ারম্যানকে নোটিশ: একই নোটিশ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা পৌরসভার মেয়রকে পাঠাতে হবে
  3. স্ত্রীকে কপি: নোটিশের একটি কপি স্ত্রীকেও দিতে হবে
  4. সালিশি পরিষদ: চেয়ারম্যান দুই পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে সালিশি পরিষদ গঠন করবেন
  5. ৯০ দিন অপেক্ষা: নোটিশের তারিখ থেকে ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে

এই ৯০ দিনের মধ্যে সালিশ সফল হলে বিবাহ টিকে যায়। ব্যর্থ হলে তালাক চূড়ান্ত হয়।

স্ত্রী কর্তৃক তালাক — খোলা তালাক

স্ত্রী দুটি পদ্ধতিতে তালাক নিতে পারেন:

১. তালাক-ই-তাফউয়িদ (Delegated Divorce): নিকাহনামায় যদি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করা থাকে, তাহলে স্ত্রী নিজেই তালাক দিতে পারবেন — একই প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যানকে নোটিশ দিয়ে।

২. খোলা তালাক (Khul): স্ত্রী যদি নিজে থেকে সম্পর্ক শেষ করতে চান, তাহলে মোহরের কিছু বা সব অংশ ফেরত দিয়ে খোলা তালাক নিতে পারেন। এর জন্য:

  • পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হবে
  • স্বামীর সম্মতি বা আদালতের আদেশ লাগবে
  • মোহর ফেরত দিতে হতে পারে

অভিজ্ঞ ডিভোর্স আইনজীবী আপনার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সঠিক পথ বাতলে দিতে পারবেন।

তালাক নামা প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে

তালাক নামা রেজিস্ট্রি করার পদ্ধতি:

  1. কাজী অফিস: স্থানীয় কাজী অফিসে বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যান
  2. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিন:
    • নিকাহনামার কপি (মূল বা সত্যায়িত)
    • উভয়পক্ষের জাতীয় পরিচয়পত্র
    • চেয়ারম্যান নোটিশের প্রমাণ
    • নিবন্ধন ফি
  3. সাক্ষী: দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষী প্রয়োজন
  4. নিবন্ধন: কাজী অফিস তালাক নামা নিবন্ধন করবে
  5. সার্টিফিকেট: নিবন্ধিত তালাক নামার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করুন

তালাকের পর স্ত্রীর আইনি অধিকার

তালাকের পর স্ত্রীর নিম্নলিখিত আইনি অধিকার রয়েছে:

  • মোহর: নিকাহনামায় নির্ধারিত সম্পূর্ণ মোহর পাওয়ার অধিকার
  • ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ: ৩ মাসের ইদ্দত পালনের সময় ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার
  • সন্তানের হেফাজত: ছেলে সন্তান ৭ বছর এবং মেয়ে সন্তান বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকে
  • সন্তানের ভরণপোষণ: সন্তান যার কাছেই থাকুক, বাবাকে খরচ দিতে হবে
  • দেনমোহর আদায়: স্বামী মোহর না দিলে আদালতে মামলা করা যায়

ইদ্দত — তালাকের পর বাধ্যতামূলক অপেক্ষা

ইদ্দত হলো তালাকের পর স্ত্রীর বাধ্যতামূলক অপেক্ষার সময়কাল। এই সময়ে অন্য বিবাহ করা নিষেধ।

  • সাধারণ ইদ্দত: ৩টি মাসিক চক্র (প্রায় ৩ মাস)
  • গর্ভবতী হলে: সন্তান প্রসব পর্যন্ত
  • মাসিক বন্ধ হলে: ৩ চান্দ্রমাস (৯০ দিন)

ইদ্দতকালে স্বামীকে ভরণপোষণ দিতে হবে। এই সময়ে স্বামী-স্ত্রী পুনর্মিলন চাইলে নতুন নিকাহ ছাড়াই পারেন (রাজআত)।

তালাক সংক্রান্ত খরচ ও সময়সীমা

তালাক প্রক্রিয়ার আনুমানিক খরচ:

  • কাজী অফিস নিবন্ধন ফি: ৫০০–১,০০০ টাকা
  • নোটারি/আইনজীবী ফি: ৩,০০০–১৫,০০০ টাকা
  • আদালতে মামলা (প্রয়োজনে): ১৫,০০০–৫০,০০০ টাকা

সময়সীমা:

  • সরল তালাক (উভয়পক্ষ রাজি): ৩–৪ মাস (৯০ দিনের ইদ্দত সহ)
  • বিতর্কিত তালাক (আদালত): ৬ মাস – ২ বছর
  • খোলা তালাক: ৩–৬ মাস

দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত প্রক্রিয়ার জন্য অভিজ্ঞ ডিভোর্স আইনজীবীর সহায়তা নিন।