তালাকনামা লেখার নিয়ম, সরকারি ফি ও আইনি প্রক্রিয়া – কাজী অফিস ও নোটিশ গাইড

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-22

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আইনি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে অগণিত মানুষ না জেনে ভুলভাবে তালাক দেওয়ায় বা কাজী অফিসের ভুল পরামর্শে পরবর্তীতে ফৌজদারি মামলা ও পারিবারিক জটিলতায় পড়েন। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী তালাক কার্যকর হতে হলে সঠিক নিয়মে তালাকনামা সম্পাদন এবং চেয়ারম্যান/মেয়র ও অপর পক্ষকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো বাধ্যতামূলক। ২০২৬ সালের সরকারি ফি, তালাকনামার সঠিক ফরম্যাট ও আইনসম্মত পদ্ধতি এই গাইডে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। যেকোনো জটিল আইনি সমস্যায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর আইনি পরামর্শ নিতে পারেন।

তালাকনামা কি এবং আইনগত গুরুত্ব

তালাকনামা হলো বিবাহবিচ্ছেদের একটি লিখিত দাপ্তরিক আইনি দলিল, যার মাধ্যমে স্বামী বা স্ত্রী বা তাদের উভয়ের পক্ষে বিবাহবন্ধন ছিন্ন করার লিখিত ঘোষণা দেওয়া হয়। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৭ ধারা এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪ অনুসারে বাংলাদেশে প্রতিটি তালাক রেজিস্ট্রেশন করা আইনি বাধ্যবাধকতা।

মৌখিকভাবে ৩ বার 'তালাক' বললেই বাংলাদেশে আইনগতভাবে তালাক সম্পন্ন হয় না। সঠিক নিয়মে তালাকনামা না লিখলে ও নোটিশ না পাঠালে স্বামী বা স্ত্রীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিবাহ, ব্যভিচার বা দেনমোহর না দেওয়ার অপরাধে আইনি মামলা হতে পারে।

আইনসম্মত তালাকনামা লেখার সঠিক নিয়ম ও শর্তাবলি

একটি আইনসম্মত তালাকনামা সরকারিভাবে অনুমোদিত নিকাহ নিবন্ধক (কাজী) বা অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে প্রস্তুত করা উচিত। তালাকনামায় নিম্নলিখিত বিবরণগুলো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হয়:

  • পক্ষদ্বয়ের বিবরণ: তালাক প্রদানকারী (স্বামী বা স্ত্রী) এবং অপর পক্ষের পূর্ণ নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর ও সচল মোবাইল নম্বর।
  • নিকাহনামার তথ্য: কত তারিখে বিবাহ হয়েছিল, কোনো কাজী অফিসে রেজিস্ট্রি হয়েছিল এবং কত টাকা দেনমোহর ধার্য ছিল।
  • তালাকের কারণ: সংক্ষেপে আইনি গ্রহণযোগ্য কারণ (যেমন বনিবনা না হওয়া, মানসিক নির্যাতন, চরিত্রগত অমিল ইত্যাদি)।
  • দেনমোহর ও খোরপোষের ঘোষণা: দেনমোহর পরিশোধ করা হয়েছে কি না বা কীভাবে পরিশোধ করা হবে এবং ইদ্দতকালের খোরপোষের বিবরণ।
  • তালাক ঘোষণার ধরন: তালাকটি কোন ধারায় দেওয়া হচ্ছে (যেমন স্বামীর একতরফা তালাক বা স্ত্রীর তালাকে তফউইজ বা খোলা তালাক)।
  • ২ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সাক্ষীর স্বাক্ষর, টিপছাপ এবং কাজীর সিল ও স্বাক্ষর।

স্বামী ও স্ত্রীর তালাক দেওয়ার আলাদা পদ্ধতি (তালাকে আহসান ও খুলা/তালাকে তফউইজ)

বাংলাদেশে স্বামী ও স্ত্রীর তালাক দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়ায় সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে:

১. স্বামীর একতরফা তালাক (Husband's Notice of Divorce):

স্বামী যেকোনো সময় তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন। এর জন্য নিকাহনামায় কোনো বিশেষ ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। স্বামী কাজী অফিসে গিয়ে তালাকনামা সই করবেন এবং কাজীর মাধ্যমে চেয়ারম্যান ও স্ত্রীর ঠিকানায় রেজিস্টার্ড ডাকে নোটিশ পাঠাবেন।

২. স্ত্রীর তালাক (তালাকে তফউইজ / Talaq-e-Tawfeez):

স্ত্রী যদি স্বামীকে তালাক দিতে চান, তবে বিবাহের কাবিননামার (নিকাহনামা) ১৮ নম্বর ঘরে স্ত্রীকে 'তালাক প্রদানের ক্ষমতা' দেওয়া হয়েছে কি না তা দেখতে হবে। যদি ১৮ নম্বর ঘরে ক্ষমতা দেওয়া থাকে, তবে স্ত্রী স্বামীর মতোই একই পদ্ধতিতে কাজী অফিসে গিয়ে স্বামীকে তালাক দিতে পারেন।

৩. খুলা তালাক বা আপস তালাক (Khula / Mutual Separation):

স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে সম্মত হয়ে যখন আপসের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ করেন, তখন দেনমোহর মওকুফ বা পারস্পরিক শর্তসাপেক্ষে খুলা তালাকনামা সম্পাদন করা হয়।

ইউনিয়ন পরিষদ/সিটি কর্পোরেশন চেয়ারম্যানকে নোটিশ পাঠানোর বাধ্যতামূলক নিয়ম

আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো নোটিশ প্রেরণ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭(১) ধারা অনুযায়ী:

তালাক প্রদানকারী ব্যক্তি তালাক সম্পাদন করার পর অনতিবিলম্বে লিখিত নোটিশের কপি পাঠাবেন:

  1. চেয়ারম্যান/মেয়রের নিকট: স্ত্রী/স্বামী যে এলাকার স্থায়ী বা বর্তমান বাসিন্দা, সেই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরের অফিসে।
  2. অপর পক্ষের নিকট: স্ত্রী বা স্বামীর স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় রেজিস্ট্রি ডাকযোগে (A/D সহ)।

চেয়ারম্যান অফিসে নোটিশ না পাঠালে আইনের ৭(২) ধারা অনুযায়ী ১ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড বা ১০,০০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

তালাক কার্যকর হওয়ার ৯০ দিনের হিসাব ও সালিশি পরিষদ

চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার পর থেকে ঠিক ৯০ দিন (৩ মাস) সময় গণনা শুরু হয়।

  • সালিশি পরিষদ গঠন: নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে নিয়ে আপস বা পুনর্মিলনের জন্য একটি 'Arbitration Council' বা সালিশি পরিষদ গঠন করবেন।
  • আপস হলে: ৯০ দিনের মধ্যে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর হয় এবং তারা আপস করেন, তবে নোটিশ প্রত্যাহার করা যাবে এবং বিবাহ বহাল থাকবে।
  • আপস না হলে: নোটিশ প্রাপ্তির ৯০ দিন পূর্ণ হওয়ার পরদিন তালাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনগতভাবে কার্যকর (Final Divorce) হয়ে যায়। কাজী তখন চূড়ান্ত তালাক সনদ (Divorce Certificate) ইস্যু করেন।
  • স্ত্রী গর্ভবতী হলে: স্ত্রী যদি নোটিশের সময় গর্ভবতী থাকেন, তবে সন্তান ভূমিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত ৯০ দিন পার হলেও তালাক স্থগিত থাকবে।

কাজী অফিসে তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি ও অন্যান্য সরকারি খরচ ২০২৬

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী তালাক রেজিস্ট্রেশনের জন্য সরকারি ফি নির্ধারিত রয়েছে। অনেক সময় অসাধু ব্যক্তিরা বেশি টাকা দাবি করে। ২০২৬ সালের হালনাগাদ ফি নিয়মমালা নিম্নরূপ:

ফি এর খাতসরকারি অনুমোদিত ফি (বিডিটি)
তালাক রেজিস্ট্রি সরকারি ফি (কাজী ফি)২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা (নির্দিষ্ট সরকারি স্কেল)
রেজিস্টার্ড ডাকে নোটিশ প্রেরণ (চেয়ারম্যান ও অপর পক্ষ)২০০ টাকা - ৩০০ টাকা (পোস্টাল চার্জ)
তালাকনামা স্ট্যাম্প ফি (৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প)৩০০ টাকা (স্ট্যাম্প মূল্য)
চূড়ান্ত তালাক সার্টিফিকেট (Divorce Certificate) ফি১০০ টাকা - ২০০ টাকা
আইনজীবী ম্যানুয়াল ড্রাফটিং ও লিগ্যাল নোটিশ ফি (ঐচ্ছিক)২,০০০ টাকা - ৫,০০০ টাকা (কেসভেদে)

মনে রাখবেন, তালাকের সময় কাজীকে দেনমোহরের টাকার ওপর শতকরা হারের কোনো রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয় না। দেনমোহরের ফি শুধু বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের সময় প্রযোজ্য।

তালাকনামা সম্পাদনে মারাত্মক ৩টি ভুল যা এড়িয়ে চলবেন

  1. চেয়ারম্যানকে নোটিশ না পাঠিয়ে কেবল কাজীর সই নেওয়া: নোটিশ না পাঠালে আইনের চোখে তালাক কার্যকর হয় না, যার ফলে পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা 'ব্যভিচার' ও 'দ্বিতীয় বিয়ে'র অপরাধে মামলা হতে পারে।
  2. স্ত্রীর দেনমোহর না দিয়ে তালাক দেওয়া: তালাক দিলে স্বামীর প্রধান দায়িত্ব স্ত্রীর দেনমোহর ও ইদ্দতকালের খোরপোষ পরিশোধ করা। এটি না দিলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে দেনমোহর আদায়ের মামলা করে স্বামীর সম্পত্তি ক্রোক করাতে পারেন।
  3. নকল বা নন-রেজিস্টার্ড কাজীর মাধ্যমে কাজ করানো: সর্বদা সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজীর ভলিউম খাতায় সই করে এবং সরকারি সিল যাচাই করে তালাক সম্পন্ন করুন।

⚖️ বিশেষজ্ঞ আইনি পরামর্শের জন্য যোগাযোগ: আপনার আইনি বিষযটি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম-এর সাথে সরাসরি কথা বলুন বা আমাদের বিশেষজ্ঞ আইনি সেবা গ্রহণ করুন। যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি যোগাযোগ পেজে ক্লিক করুন।