ভাড়াটিয়া বাসা বা দোকান খালি করছে না? বছরের পর বছর মামলা না ঝুলিয়ে উচ্ছেদের কার্যকর লিগ্যাল নোটিশ ও কৌশল

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-13

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অনেক ভাড়াটিয়া দোকান বা বাণিজ্যিক স্পেস ছাড়তে চায় না, ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেয় এবং নানা টালবাহানা করে বছরের পর বছর সম্পত্তি দখলে রাখে। রাগের মাথায় পানি-বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন না করে আইনসঙ্গতভাবে কীভাবে স্বল্পতম সময়ে আদালত থেকে উচ্ছেদ ডিক্রি নেবেন, তা নিয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন দেওয়ানি আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।

বাড়িওয়ালাদের সাধারণ ভুল: গায়ের জোরে তালা দেওয়া বা গ্যাস-বিদ্যুৎ কাটার ঝুঁকি

ভাড়াটিয়া বাসা বা দোকান না ছাড়লে অনেক মালিক ক্ষিপ্ত হয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন, ভাড়াটিয়াকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন কিংবা পানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন কেটে দেন। এটি একটি মারাত্মক ভুল। বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ভাড়াটিয়ার আবশ্যিক ইউটিলিটি সার্ভিস বন্ধ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে অসাধু ভাড়াটিয়া নিজেই থানায় গিয়ে বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে উল্টো তাকে জেলের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ বনাম সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ অনুযায়ী—ভাড়াটিয়া যদি নিয়মিত ভাড়া প্রদান করে, তবে তাকে সহজে উচ্ছেদ করা যায় না। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ (Transfer of Property Act)-এর ১০৬ ধারা অনুযায়ী—যদি চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায় কিংবা বাড়িওয়ালার নিজের ব্যবসা বা বসবাসের যুক্তিসঙ্গত প্রয়োজন (Bonafide Requirement) দেখা দেয় এবং ভাড়াটিয়া ডিফল্টার হয়, তবে আইনানুগ নোটিশ দিয়ে তাকে উচ্ছেদ করা শতভাগ বৈধ অধিকার।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১০৬ ধারায় নিখুঁত লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর নিয়ম

উচ্ছেদ মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো আইনের ১০৬ ধারার নোটিশ। আবাসিক বাসার ক্ষেত্রে ১৫ দিনের এবং বাণিজ্যিক দোকান বা কারখানার ক্ষেত্রে অন্তত ৩০ দিন পূর্বে রেজিস্ট্রি এ/ডি ডাকযোগে সুস্পষ্ট উচ্ছেদের নোটিশ পাঠাতে হবে। নোটিশের ভাষা এবং প্রেরণের তারিখ নির্ভুল না হলে পরবর্তীতে দেওয়ানি আদালত মামলাটি খারিজ করে দিতে পারেন।

সহকারী জজ আদালতে উচ্ছেদ মোকদ্দমা (Eviction Suit) দায়ের

নোটিশের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই স্থানীয় সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে উচ্ছেদ মোকদ্দমা (Eviction Suit) দায়ের করতে হবে। আর্জিতে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে যে ভাড়া চুক্তির অবসান ঘটেছে এবং নোটিশ সত্ত্বেও বিবাদী বেআইনিভাবে জবরদখল বজায় রেখেছে।

বকেয়া ভাড়া ও ক্ষতিপূরণ (Mesne Profits) আদায়ের আবেদন

উচ্ছেদের পাশাপাশি নোটিশের পর থেকে যেদিন পর্যন্ত ভাড়াটিয়া অবৈধভাবে দোকান বা ফ্ল্যাট দখল করে রাখবে, সেই পুরো সময়ের জন্য বাজারমূল্য অনুযায়ী দৈনিক বা মাসিক হারে ক্ষতিপূরণ (Mesne Profits) দাবি করা যায়। আদালত ডিক্রির সাথে সাথে এই বিপুল অংকের বকেয়া ক্ষতিপূরণও মালিকের অনুকূলে অনুমোদন করেন।

আদালত কর্তৃক বেলিক ও পুলিশ কমিশনারের উপস্থিতিতে দখল গ্রহণ

মামলার ডিক্রি হওয়ার পর যদি ভাড়াটিয়া স্বেচ্ছায় চাবি হস্তান্তর না করে, তবে বিজ্ঞ আদালত জারি মামলার মাধ্যমে ‘নাজির বা বেলিক’ এবং পর্যাপ্ত পুলিশ ফোর্স নিয়োগ করেন। পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দোকানের তালা ভেঙে মালামালের ইনভেন্টরি করে সম্পূর্ণ স্পেসটি মালিককে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

ভবিষ্যতে ঝামেলা এড়াতে ভাড়া চুক্তিতে যে শর্তগুলো রাখা আবশ্যক

ভাড়াটিয়া ওঠানোর পূর্বে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে রেজিস্ট্রিকৃত চুক্তিতে স্পষ্ট শর্ত রাখুন:

  1. নির্দিষ্ট মেয়াদ (যেমন: ২ বা ৩ বছর) এবং মেয়াদ শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাপ্তির শর্ত।
  2. প্রতি মাসের ৭ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে ব্যাংকে ভাড়া পরিশোধের নিয়ম।
  3. ভাড়া বকেয়া হলে কোনো নোটিশ ছাড়াই চুক্তি বাতিলের স্পষ্ট ধারা।