ভাড়াটিয়া বাড়ি বা দোকান না ছাড়লে উচ্ছেদের আইনি নিয়ম ২০২৬ — নোটিশ ও মামলা

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-10

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশে বাড়ি বা বাণিজ্যিক দোকান ভাড়া দেওয়ার পর অনেক বাড়িওয়ালাই এক তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন—চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও ভাড়াটিয়া প্রাঙ্গণ খালি করছে না, বছরের পর বছর ভাড়া বকেয়া রাখছে কিংবা উল্টো বাড়িওয়ালাকেই নানা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছে। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে জোরপূর্বক ভাড়াটিয়ার তালা ভেঙে দেওয়া বা বিদ্যুৎ-গ্যাস লাইন কেটে দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ, যার কারণে বাড়িওয়ালা নিজেই আইনি ফাঁদে পড়ে যেতে পারেন। এর সঠিক ও টেকসই সমাধান হলো দেশের প্রচলিত 'বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১' এবং দেওয়ানি কার্যবিধির আওতায় সুনির্দিষ্ট উচ্ছেদ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। এই আর্টিকেলে জানুন অবৈধ ভাড়াটিয়া উচ্ছেদের আইনি নোটিশ, উচ্ছেদ মোকদ্দমা এবং দ্রুত প্রাঙ্গণের দখল ফিরে পাওয়ার সম্পূর্ণ বাস্তব কৌশল।

১৯৯১ সালের বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী একজন বৈধ ভাড়াটিয়াকে চাইলেই ইচ্ছামতো যেকোনো সময় উচ্ছেদ করা যায় না। তবে নিচের যেকোনো একটি আইনি কারণ বিদ্যমান থাকলে আদালত উচ্ছেদের আদেশ দিতে বাধ্য:

  • ভাড়া বকেয়া রাখা (Default in Rent): চুক্তিপত্রের শর্তানুযায়ী মাসের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (অথবা আইনানুযায়ী পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে) ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হলে তিনি খেলাপকারী বা ডিফল্টার বলে গণ্য হবেন।
  • বাড়িওয়ালার নিজস্ব বা পারিবারিক যুক্তিসঙ্গত প্রয়োজন (Bona fide Requirement): বাড়িওয়ালার নিজের বসবাসের জন্য বা নিজের কোনো ব্যবসা পরিচালনার জন্য উক্ত প্রাঙ্গণটি যুক্তিসঙ্গতভাবে অপরিহার্য হলে।
  • অননুমোদিত সাব-লেট (Sub-letting): বাড়িওয়ালার লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া প্রাঙ্গণ অন্য কারো কাছে ভাড়া বা উপ-ভাড়া দিলে।
  • সম্পত্তির ক্ষতিসাধন বা পরিবর্তন: বাড়িওয়ালার সম্মতি ছাড়া দেয়াল ভাঙা, ভবনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন বা সম্পত্তির অবমূল্যায়ন ঘটানো।
  • উপদ্রব সৃষ্টি ও অনৈতিক ব্যবহার (Nuisance): প্রতিবেশীদের শান্তি বিঘ্নিত করা বা ভবনে কোনো অনৈতিক/বেআইনি কাজ পরিচালনা করা।

অনেক বাড়িওয়ালা ক্ষিপ্ত হয়ে ভাড়াটিয়ার বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন অথবা মালামাল রাস্তায় ফেলে তালা ঝুলিয়ে দেন। আইন অনুযায়ী এটি মারাত্মক ভুল পদক্ষেপ।

⚠️ বাড়িওয়ালার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ২৭ ও ৩১ ধারা অনুযায়ী বাড়িওয়ালা যদি কোনো অপরিহার্য সেবা (পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস) ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে দেন, তবে ভাড়াটিয়া রেন্ট কন্ট্রোলারের (ভাড়া নিয়ন্ত্রক) আদালতে দরখাস্ত করতে পারেন। এতে বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে জরিমানা ও দণ্ড হতে পারে। সুতরাং কখনো নিজে আইন হাতে তুলে নেবেন না, আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়াই শতভাগ নিরাপদ।

উচ্ছেদ মামলার বিভিন্ন ধাপ এবং আদালতের প্রক্রিয়ার সময় ও ব্যয়ের একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:

মামলার পর্যায়প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও করণীয়আনুমানিক সময়সীমা
১. লিগ্যাল নোটিশআইনজীবীর মাধ্যমে রেজিস্ট্রি এ/ডি ডাকযোগে নোটিশ প্রেরণ১৫ থেকে ৩০ দিন নোটিশ পিরিয়ড
২. উচ্ছেদ মামলা দায়েরসিনিয়র সহকারী জজ আদালতে আরজি ও কোর্ট ফি দাখিল১ থেকে ২ সপ্তাহ
৩. সমন ও লিখিত জবাবভাড়াটিয়ার কাছে কোর্ট সমন জারি ও তার জবাব দাখিল১ থেকে ৩ মাস
৪. বিচার ও উচ্ছেদ ডিক্রিউভয় পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে চুড়ান্ত রায়৬ থেকে ১২ মাস
৫. ডিক্রি জারি (Execution)আদালতের নাজির ও পুলিশ পাহারায় প্রাঙ্গণ দখল উদ্ধার১ থেকে ২ মাস

উচ্ছেদ মোকদ্দমা দায়ের করার পূর্বে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ (Transfer of Property Act)-এর ১০৬ ধারা অনুযায়ী ভাড়াটিয়াকে যথাযথ আইনি নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক।

বাড়ি বা বাণিজ্যিক দোকানের ক্ষেত্রে সাধারণত ১৫ দিনের নোটিশ (বাৎসরিক লিজের ক্ষেত্রে ৬ মাসের নোটিশ) প্রদান করতে হয়। নোটিশে বাড়িওয়ালার মালিকানা, ভাড়ার শর্তভঙ্গ বা নিজস্ব প্রয়োজনের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। নোটিশটি রেজিস্ট্রি ডাকযোগে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র (A/D) সহ পাঠাতে হবে এবং কুরিয়ার ও হোয়াটসঅ্যাপেও কপি সংরক্ষণ করা বিচক্ষণতার পরিচয়। নোটিশের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন থেকেই ভাড়াটিয়া অবৈধ দখলদার হিসেবে গণ্য হন।

নোটিশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রাঙ্গণ খালি না করলে স্থানীয় সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে উচ্ছেদ মোকদ্দমা দায়ের করা হয়। মামলায় একই সাথে বকেয়া ভাড়া আদায় এবং উচ্ছেদের তারিখ পর্যন্ত মেসনে প্রফিট (Mesne Profits বা দখলজনিত ক্ষতিপূরণ) দাবি করতে হয়।

বিজ্ঞ আদালত রায় ও ডিক্রি দিলে ভাড়াটিয়াকে প্রাঙ্গণ ত্যাগের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেন। ভাড়াটিয়া নিজে থেকে সরে না গেলে দেওয়ানি কার্যবিধির ২১ আদেশের আওতায় 'জারি মামলা' (Execution Case) করে আদালতের নাজির এবং প্রয়োজনে থানার পুলিশের উপস্থিতিতে ঘরের তালা ভেঙে বাড়িওয়ালাকে প্রাঙ্গণের বাস্তব দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

উচ্ছেদ মোকদ্দমার জটিলতা শুরু থেকেই এড়াতে একটি শক্ত আইনি চুক্তিপত্র (Tenancy Agreement) অপরিহার্য। ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি সম্পাদনের পাশাপাশি এটি নোটারি পাবলিক বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সত্যায়িত করা থাকলে ভাড়াটিয়ার পক্ষে কোনো কাল্পনিক দাবি তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। চুক্তিপত্রে অবশ্যই ৫টি অপরিহার্য ধারা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে: (১) চুক্তির নির্দিষ্ট মেয়াদ ও নবায়নের সুনির্দিষ্ট শর্ত, (২) প্রতি ইংরেজি মাসের কত তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ বাধ্যতামূলক, (৩) পরপর দুই মাস ভাড়া বকেয়া পড়লে চুক্তি বাতিল ও প্রাঙ্গণ ছাড়ার শর্ত, (৪) কোনো অবস্থাতেই সাব-লেট বা তৃতীয় পক্ষকে দখল না দেওয়ার শর্ত, এবং (৫) চুক্তির মেয়াদান্তে উচ্ছেদের জন্য নোটিশের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা (১৫ বা ৩০ দিন)। বাড়ি ভাড়া আইন ১৯৯১ অনুযায়ী নোটিশে উল্লেখিত সময় পার হওয়ার পর ভাড়াটিয়া দখল বজায় রাখলে তিনি অনধিকার প্রবেশকারী (Trespasser) হিসেবে গণ্য হবেন।

দেওয়ানি কার্যবিধির ২(১২) ধারা অনুযায়ী 'মেসনে প্রফিট' বা মধ্যবর্তী মুনাফা হলো এমন আর্থিক ক্ষতিপূরণ, যা কোনো অবৈধ দখলদার কর্তৃক সম্পত্তি আটকে রাখার কারণে প্রকৃত মালিক প্রাপ্য হন। উচ্ছেদ মামলায় কেবল প্রাঙ্গণ খালি করার ডিক্রি চাইলেই চলে না, বরং নোটিশের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন থেকে শুরু করে বাড়িওয়ালার হাতে প্রাঙ্গণ বুঝিয়ে দেওয়ার দিন পর্যন্ত বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী দৈনিক বা মাসিক হারে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি বাণিজ্যিক দোকানের স্বাভাবিক মাসিক ভাড়া ৫০ হাজার টাকা হয় এবং ভাড়াটিয়া অবৈধভাবে ১ বছর দোকান আটকে রাখে, তবে আদালত মূল বকেয়া ভাড়ার পাশাপাশি আরও অতিরিক্ত ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত মেসনে প্রফিট ডিক্রি দিতে পারেন। এই ডিক্রি অমান্য করলে বিবাদীর অন্যান্য ব্যাংক হিসাব বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্রোক করে টাকা আদায়ের সরকারি ব্যবস্থা রয়েছে।

উচ্ছেদ মোকদ্দমার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সুপ্রতিষ্ঠিত নজির হলো: যদি নোটিশ অব কুইট (Notice to Quit)-এ কোনো মৌলিক আইনি ত্রুটি থাকে, তবে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ মোকদ্দমাই সরাসরি খারিজ হয়ে যাবে। নোটিশের ভাষা হতে হবে দ্ব্যর্থহীন। নিচে আইনজীবীর মাধ্যমে প্রেরিত নোটিশের একটি প্রমিত রূপরেখা তুলে ধরা হলো:

আইনি নোটিশের নমুনা অংশ:
"এতদ্বারা আপনাকে জানানো যাইতেছে যে, আপনি নিম্ন তফশিল বর্ণিত দোকান/বাসা প্রতি ইংরেজি মাসে ... টাকা ভাড়ায় অস্থায়ীভাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন। কিন্তু গত ... তারিখ হইতে ... তারিখ পর্যন্ত সর্বমোট ... টাকা ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হইয়া আপনি বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত খেলাপকারী সাব্যস্ত হইয়াছেন। তদুপরি নোটিশদাতার ব্যক্তিগত ব্যবসার জন্য উক্ত প্রাঙ্গণটি অতীব জরুরি। অতএব, এই নোটিশ প্রাপ্তির ১৫ (পনেরো) দিনের মধ্যে বকেয়া ভাড়া পরিশোধপূর্বক প্রাঙ্গণটি নোটিশদাতার অনুকূলে সম্পূর্ণ খালি করিয়া দখল বুঝাইয়া দিবেন। ব্যর্থতায় আপনার বিরুদ্ধে দেওয়ানি আদালতে উচ্ছেদ মোকদ্দমা দায়ের করা হইবে এবং উক্ত সময়ের জন্য মাসিক ... টাকা হারে মেসনে প্রফিট দাবি করা হইবে।"

উচ্চ আদালতের নজির (৪৪ ডিএলআর পৃষ্ঠা ২৩) অনুযায়ী, রেজিস্ট্রি ডাকযোগে প্রেরিত নোটিশ যদি ভাড়াটিয়া গ্রহণ করতে অস্বীকার করে বা 'ফিরে এসেছে' (Returned unclaimed) হিসেবে রসিদ আসে, তবুও আইন অনুযায়ী তা যথাযথভাবে জারি হয়েছে (Good service) বলে গণ্য হবে।

উচ্ছেদ মামলা পরিচালনার পূর্বে বাড়িওয়ালাদের মামলার সামগ্রিক আর্থিক ব্যয় ও সময় সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা আবশ্যক। দেওয়ানি আদালত ফি আইন অনুযায়ী সহকারী জজ আদালতে বাৎসরিক ভাড়ার ওপর নির্দিষ্ট কোর্ট ফি নির্ধারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, মাসিক ভাড়া ২০ হাজার টাকা হলে এক বছরের ভাড়া ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা; এর ওপর সরকারি কোর্ট ফি এবং প্রসেস ফি সাধারণত কয়েক হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একজন অভিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবীর ড্রাফটিং ফি এবং শুনানির ফি মামলার স্তরভেদে নির্ধারিত হয়।

মামলা দায়ের থেকে শুরু করে সমন জারি, জবাব দাখিল, বিচারিক সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ডিক্রি জারি পর্যন্ত সাধারণত ৬ থেকে ১২ মাস সময় লাগে। তবে ভাড়াটিয়া যদি সময়ক্ষেপণের জন্য অহেতুক মুলতবি প্রার্থনা করে, তবে বিজ্ঞ আদালত দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৫খ ধারা অনুযায়ী বিবাদীর ওপর নগদ খরচ (Cost) ধার্য করে দ্রুত শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেন। ডিক্রি পাওয়ার পর জারি মামলার মাধ্যমে সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে দখল উদ্ধার সম্পন্ন হয়, যা বাড়িওয়ালার দীর্ঘদিনের উদ্বেগের চূড়ান্ত অবসান ঘটায়।

⚖️ বাড়ি ও দোকান উচ্ছেদে অভিজ্ঞ আইনি সহায়তা

বাড়ি বা দোকানের সম্পত্তি বছরের পর বছর আটকে থাকলে আর্থিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতি হয়। সঠিক আইনি ড্রাফটিং ও বলিষ্ঠ শুনানির মাধ্যমে দ্রুত ডিক্রি ও দখল পুনরুদ্ধারে অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ততার সাথে আইনি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করছেন।

সরাসরি চেম্বার পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন:
📞 ফোন / হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৭১২৬৫৫৫৪৬ (01712655546)
📍 চেম্বার: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ভবন, ঢাকা।