বোনদের বাদ দিয়ে ভুয়া ওয়ারিশান সনদে জমি বিক্রি: সাব-রেজিস্ট্রারের দলিল বাতিলের বাস্তব কেস স্টাডি

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-13

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

পিতার মৃত্যুর পর অনেক অসাধু ভাই ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে বোনদের নাম গোপন করে ভুয়া ওয়ারিশান সনদ (Warish Sanad) তৈরি করে এবং সম্পূর্ণ পৈতৃক জমি গোপনে তৃতীয় পক্ষের নিকট বিক্রি করে দেয়। বোন বা বঞ্চিত শরিকরা বিষয়টি জানতে পেরে দলিল বাতিলের জন্য আদালতে কীভাবে লড়াই করবেন এবং জমি ফিরিয়ে আনবেন, তার বাস্তব নজির বিশ্লেষণ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।

বাস্তব ঘটনা: বোনদের নাম বাদ দিয়ে ২০ কাঠা পৈতৃক জমি বিক্রির অপচেষ্টা

উত্তরা এলাকার একটি বাস্তব মামলায় দেখা যায়, পিতা মারা যাওয়ার পর দুই ছেলে গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বোনদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ গোপন করে একটি ওয়ারিশান সনদ তৈরি করে। এরপর সেই সনদ দিয়ে নামজারি করিয়ে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ২০ কাঠা জমি এক ডেভেলপারের কাছে রেজিস্ট্রি করে দেয়। বোনেরা যখন বিষয়টি জানতে পারেন, তখন ডেভেলপার জমিতে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে। এমন সংকটজনক পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক দেওয়ানি ও প্রশাসনিক লড়াইয়ের মাধ্যমে দলিলটি বাতিল করা সম্ভব হয়েছিল।

জালিয়াতির প্রক্রিয়া: যেভাবে স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানের চোখ ফাঁকি দেওয়া হয়

অসৎ ব্যক্তিরা মিথ্যা তথ্য ও ভুয়া সাক্ষীদের উপস্থিতিতে স্থানীয় চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলর কার্যালয়ে হলফনামা জমা দিয়ে ওয়ারিশান সনদ বের করে। সাব-রেজিস্ট্রার রেজিস্ট্রির সময় খতিয়ান ও ওয়ারিশান সনদ দেখে দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন, কিন্তু ভেতরে যে অন্য বৈধ উত্তরাধিকারীরা বাদ পড়েছেন তা প্রাথমিক নথিতে ধরা পড়ে না।

ইউপি চেয়ারম্যান কি দলিল বাতিল করতে পারেন? সাধারণ মানুষের ভুল

ভুক্তভোগী বোনেরা শুরুতে চেয়ারম্যানের কাছে গিয়ে হট্টগোল করেন এবং চেয়ারম্যান একটি চিঠি দিয়ে সনদটি বাতিল ঘোষণা করেন। কিন্তু মনে রাখবেন, চেয়ারম্যান সনদ বাতিল করলেও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। রেজিস্ট্রিকৃত দলিল বাতিল করার একমাত্র একচ্ছত্র এখতিয়ার দেওয়ানি আদালতের।

দেওয়ানি আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারায় দলিল বাতিলের মামলা

বঞ্চিত শরিকদের অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট যুগ্ম জেলা জজ আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী ‘জাল ও প্রতারণামূলক দলিল বাতিল ও অকার্যকর ঘোষণা’ (Cancellation of Sale Deed) চেয়ে মামলা করতে হবে। একই সাথে বণ্টনের (Partition) প্রার্থনা যুক্ত করতে হবে। আদালত শুনানি শেষে মূল দলিলটি বাতিল ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারকে বালাম বইয়ে বাতিলের নোট দেওয়ার আদেশ পাঠান।

জমিতে ক্রেতার নামজারি (Mutation) ঠেকানোর উপায়: সহকারী কমিশনার (ভূমি)-তে মিস কেস

ক্রেতা যাতে ওই ভুয়া দলিলের ওপর ভিত্তি করে দ্রুত নিজের নামে খাজনা-খারিজ করিয়ে নিতে না পারে, সেজন্য অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট এসি ল্যান্ড (AC Land) অফিসে একটি মিস কেস (Misc Case) ফাইল করতে হবে এবং দেওয়ানি মামলার কাগজপত্র দাখিল করে নামজারি নামঞ্জুর বা স্থগিতের আবেদন করতে হবে।

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩-এর আওতায় জেল ও জরিমানা

দেওয়ানি মোকদ্দমার পাশাপাশি প্রতারক ভাই ও সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে নতুন ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩-এর ৪ ও ৫ ধারা এবং পেনাল কোডের ৪৬৮/৪৭১ ধারায় সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যায়। এতে ভুয়া সনদে জমি বিক্রির অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে।

প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেকলিস্ট

মামলার ফাইল তৈরিতে যা যা লাগবে:

  1. বাবার মূল সিএস, এসএ, আরএস ও সিটি খতিয়ানের কপি।
  2. পিতার মৃত্যু সনদ এবং পারিবারিক সঠিক ওয়ারিশান সনদ।
  3. প্রতারণামূলকভাবে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের নকল (Certified Copy)।
  4. বঞ্চিত সকল শরিক বা বোনদের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)।