হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ও কল রেকর্ড কি আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য? ডিজিটাল এভিডেন্স আইন ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-15

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

প্রতারণা, অর্থ লেনদেন, পারিবারিক কলহ কিংবা পরকীয়ার অভিযোগে আজকাল প্রায় প্রতিটি মামলাতেই বাদীপক্ষ হাজির করেন হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশট বা মোবাইলের অডিও কল রেকর্ড। কিন্তু নিছক একটি প্রিন্টআউট স্ক্রিনশট জমা দিলেই কি আদালত তা সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করবেন? ডিজিটাল প্রমাণ প্রমাণের আইনি প্রক্রিয়া বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।

১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন ও ২০২২ সালের ঐতিহাসিক ডিজিটাল সংশোধনী

ঐতিহ্যগতভাবে ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনে (Evidence Act) শুধু কাগজ-কলমের কাগুজে দলিলকে প্রাথমিক (Primary) বা মাধ্যমিক (Secondary) সাক্ষ্য গণ্য করা হতো। তবে ২০২২ সালের যুগান্তকারী সংশোধনীর মাধ্যমে ডিজিটাল রেকর্ড, ইমেইল, এসএমএস, সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বার্তা আইনিভাবে ‘দলিল’ বা সাক্ষ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের নিছক স্ক্রিনশট কেন যথেষ্ট নয়?

আজকাল ফটোশপ বা বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ দিয়ে কয়েক সেকেন্ডে হুবহু নকল চ্যাট তৈরি করা সম্ভব। তাই আদালতে শুধু এ-ফোর (A4) কাগজে প্রিন্ট করা হোয়াটসঅ্যাপের স্ক্রিনশট দিলে আদালত তা সহজেই নাকচ করতে পারেন যদি না মূল মোবাইল হ্যান্ডসেট, সিম কার্ড এবং প্রেরক-গ্রাহকের ফোন নম্বর সম্পর্কিত বিটিআরসি (BTRC) বা মেটা-র সার্ভার লগ ও ফরেনসিক সত্যায়ন দাখিল করা হয়।

কল রেকর্ড (Audio Recording) আদালতে প্রমাণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

ফোনে কথোপকথনের অডিও রেকর্ড কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলায় সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে নিম্নলিখিত আইনি শর্ত পূরণ বাধ্যতামূলক:

  • মূল রেকর্ডিং ডিভাইস (যেমন মোবাইল ফোন বা ভয়েস রেকর্ডার) বিজ্ঞ আদালতে প্রদর্শন করতে হবে।
  • রেকর্ডিংয়ে কোনো ধরনের সম্পাদনা (Editing/Cutting/Splicing) বা ব্যাকগ্রাউন্ড টেম্পারিং নেই তা নিশ্চিত হতে হবে।
  • আদালতের আদেশে রেকর্ডের কণ্ঠস্বর আসামির কি না তা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে স্পিচ স্পেকট্রোগ্রাফি টেস্ট (Voice Matching) করানো যায়।

ডিজিটাল প্রমাণের চেইন অব কাস্টডি (Chain of Custody) ও সিআইডি ফরেনসিক

সাইবার মামলায় প্রমাণের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো ‘চেইন অব কাস্টডি’। পুলিশ বা তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিভাইসটি জব্দ করার পর থেকে ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো এবং আদালতে উপস্থাপনের আগ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি যেন মেমোরিতে হস্তক্ষেপ না করে, তা সিলগালা (Sealed) অবস্থায় লিপিবদ্ধ থাকতে হয়। এই চেইনে ত্রুটি দেখা দিলে পুরো ডিজিটাল সাক্ষ্যই বাতিল গণ্য হতে পারে।

আইনবহির্ভূতভাবে গোপন কল রেকর্ড কি মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে?

বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের যোগাযোগ ও চিঠিপত্রের গোপনীয়তা রক্ষার মৌলিক অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০১ অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তা বা আইনগত অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ফোন ট্যাপ করা বা গোপন কল রেকর্ড ফাঁস করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে অপরাধ তদন্তের স্বার্থে আদালতের অনুমতিসাপেক্ষে বা সরাসরি ভিকটিম নিজের সুরক্ষায় রেকর্ড করলে আদালত তা ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিবেচনা করতে পারেন।

আদালতে ডিজিটাল এভিডেন্স দাখিলের ক্ষেত্রে আইনজীবীর করণীয় চেকলিস্ট

  1. মূল মেমোরি কার্ড বা হ্যান্ডসেট বিজ্ঞ আদালতের হেফাজতে জমা দেওয়ার আবেদন জানান।
  2. ডিজিটাল সাক্ষ্যটি কোন তারিখ, সময় ও কোন ডিভাইসে ধারণ করা হয়েছিল তার পূর্ণ এফিডেভিট দাখিল করুন।
  3. প্রতিপক্ষ অস্বীকার করলে তাৎক্ষণিক নিরপেক্ষ ফরেনসিক টেস্টের আবেদন জানান।
  4. সার্টিফায়েড ডিজিটাল এক্সপার্ট ওপেনিয়ন সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা মোতাবেক গ্রহণ করান।