লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-07
বাংলাদেশে বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তি কীভাবে বন্টন হবে তা নিয়ে প্রতিটি পরিবারে প্রশ্ন থাকে। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী ছেলে ও মেয়ের অংশ নির্ধারিত, তবে অনেকেই এই নিয়মগুলো সঠিকভাবে জানেন না। এই বিস্তারিত গাইডে আমরা বাবার সম্পত্তি বন্টনের সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া, অংশের হিসাব এবং আপনার অধিকার রক্ষার উপায় আলোচনা করব।
বাংলাদেশে মুসলিম নাগরিকদের সম্পত্তি বন্টন মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭ এবং ইসলামিক উত্তরাধিকার বিধি (ফারায়েজ) অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এছাড়া মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এবং পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাবার সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত মূলনীতিগুলো প্রযোজ্য:
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাবার স্থাবর ও অস্থাবর উভয় সম্পত্তিই এই আইনের আওতায় পড়ে। জমি, বাড়ি, ব্যাংক আমানত, শেয়ার, ব্যবসায়িক সম্পদ — সবকিছুই উত্তরাধিকারসূত্রে বন্টনযোগ্য।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের আদালতে সম্পত্তি বন্টন সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সঠিক আইনি জ্ঞান অর্জন করা এখন আরও বেশি জরুরি।
মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে ওয়ারিশদের তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
এই ওয়ারিশরা কোরআনে নির্ধারিত নির্দিষ্ট অংশ পান। এদের মধ্যে রয়েছেন: স্বামী বা স্ত্রী, কন্যা, পুত্রের কন্যা, পিতা, মাতা, দাদা, দাদি, নানি, সহোদর বোন প্রমুখ।
নির্দিষ্ট অংশীদারদের অংশ দেওয়ার পর যা বাকি থাকে তা পান। পুত্র, পৌত্র, পিতা, দাদা এবং পুরুষ আত্মীয়রা এই শ্রেণিতে পড়েন।
প্রথম দুই শ্রেণির কোনো ওয়ারিশ না থাকলে এরা সম্পত্তি পান। নানা, মামা, খালা, ভাগনে ইত্যাদি এই শ্রেণিতে আসেন।
| ওয়ারিশ | শ্রেণি | অংশ |
|---|---|---|
| পুত্র | আসাবা | কন্যার দ্বিগুণ |
| কন্যা | জাওয়িল ফুরুদ | পুত্রের অর্ধেক |
| স্ত্রী (সন্তান থাকলে) | জাওয়িল ফুরুদ | ১/৮ |
| স্ত্রী (সন্তান না থাকলে) | জাওয়িল ফুরুদ | ১/৪ |
| মাতা (সন্তান থাকলে) | জাওয়িল ফুরুদ | ১/৬ |
| পিতা (সন্তান থাকলে) | জাওয়িল ফুরুদ | ১/৬ |
মনে রাখবেন, বাবার সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে প্রথমে বাবার ঋণ পরিশোধ করতে হবে, তারপর ওসিয়ত পূরণ করতে হবে (মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ ১/৩), তারপরই বাকি সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে।
ইসলামিক উত্তরাধিকার আইনের সবচেয়ে পরিচিত নিয়ম হলো ছেলে পাবে মেয়ের দ্বিগুণ — যা ২:১ অনুপাত নামে পরিচিত। এই নিয়মটি পবিত্র কোরআনের সূরা নিসার ১১ নম্বর আয়াতে সরাসরি উল্লেখ আছে।
উদাহরণ ১: বাবার মোট সম্পত্তি ৬০ লক্ষ টাকা। ওয়ারিশ: ২ ছেলে ও ২ মেয়ে। (স্ত্রী ও অন্যান্য ওয়ারিশ নেই ধরে নিই)
| ওয়ারিশ | অংশ | পরিমাণ |
|---|---|---|
| প্রতিটি ছেলে | ২ ভাগ | ২০ লক্ষ টাকা |
| প্রতিটি মেয়ে | ১ ভাগ | ১০ লক্ষ টাকা |
| মোট | ৬ ভাগ | ৬০ লক্ষ টাকা |
উদাহরণ ২: বাবার মোট সম্পত্তি ৪৮ লক্ষ টাকা। ওয়ারিশ: স্ত্রী (১ জন), ১ ছেলে, ২ মেয়ে।
| ওয়ারিশ | অংশ | পরিমাণ |
|---|---|---|
| স্ত্রী (সন্তান থাকায়) | ১/৮ = ৬ লক্ষ | ৬ লক্ষ টাকা |
| ছেলে (বাকির ২/৪) | ২ ভাগ | ২১ লক্ষ টাকা |
| প্রতিটি মেয়ে (বাকির ১/৪) | ১ ভাগ | ১০.৫ লক্ষ টাকা |
শুধু মেয়ে থাকলে: যদি বাবার শুধু মেয়ে থাকে (কোনো ছেলে না থাকে), তাহলে:
এই হিসাবগুলো সঠিকভাবে করতে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাহায্য নেওয়া উচিত, কারণ ওয়ারিশের সংখ্যা ও ধরন পরিবর্তিত হলে হিসাব জটিল হয়ে যায়।
অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে — বাবা বেঁচে থাকলে কি সন্তানরা সম্পত্তির দাবি করতে পারবে? এর সরল উত্তর হলো: না। বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তানরা বাবার সম্পত্তির উপর কোনো আইনি উত্তরাধিকারী অধিকার রাখে না।
তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে সন্তানরা সম্পত্তির অধিকার দাবি করতে পারে:
সাধারণভাবে না। বাবা তার নিজস্ব অর্জিত সম্পত্তি যেকোনো সময় বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারেন। তবে যদি প্রমাণ করা যায় যে:
— তাহলে আদালতে নিষেধাজ্ঞা আবেদন করা সম্ভব। পারিবারিক আইন বিষয়ক আরও তথ্য জানতে এখানে ক্লিক করুন।
বাংলাদেশের আইনে বাবার পৈতৃক সম্পত্তি (যা তিনি তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন) এবং অর্জিত সম্পত্তি (যা তিনি নিজে উপার্জন করেছেন) — দুটিই মৃত্যুর পর একইভাবে বন্টিত হয়। হিন্দু আইনের মতো মুসলিম আইনে জন্মের সাথে সাথে পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার জন্মায় না।
বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তি বন্টনের জন্য নিম্নলিখিত ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশন থেকে মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করুন। এটি সব আইনি কাজের ভিত্তি।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা পৌরসভা থেকে ওয়ারিশান সনদ (Succession Certificate) নিন। এতে সকল ওয়ারিশের নাম থাকবে।
বাবার সমস্ত সম্পত্তির তালিকা তৈরি করুন — জমি (দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর সহ), বাড়ি, ব্যাংক একাউন্ট, গাড়ি ইত্যাদি।
বাবার যেকোনো ঋণ (ব্যাংক লোন, ব্যক্তিগত ঋণ) পরিশোধ করতে হবে। ঋণ না মিটিয়ে সম্পত্তি বন্টন করা আইনসম্মত নয়।
বাবা যদি কোনো ওসিয়ত রেখে যান, তা মোট সম্পত্তির ১/৩ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে পালন করতে হবে।
সকল ওয়ারিশ সম্মত হলে পারস্পরিক সমঝোতায় বন্টন করুন এবং ভূমি অফিসে নামজারির আবেদন করুন। নামজারি আবেদন ট্র্যাক করার নির্দেশিকা দেখুন।
| ধাপ | কাজ | সময়কাল | কোথায় |
|---|---|---|---|
| ১ | মৃত্যু সনদ | ১-৩ দিন | ইউপি/পৌরসভা |
| ২ | ওয়ারিশান সনদ | ৭-১৫ দিন | ইউপি/পৌরসভা |
| ৩ | সম্পত্তির তালিকা | পরিবর্তনশীল | ভূমি অফিস, ব্যাংক |
| ৪ | নামজারি আবেদন | ৩০-৯০ দিন | ভূমি অফিস/AC Land |
| ৫ | বায়না দলিল/বন্টন দলিল | ১-৭ দিন | সাব-রেজিস্ট্রি অফিস |
বাবার সম্পত্তি বন্টনে শুধু ছেলেমেয়ে নয়, স্ত্রী, মা এবং অন্যান্য ওয়ারিশরাও অংশ পান। এই বিষয়টি অনেকেই ঠিকমতো জানেন না বলে পরিবারে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
| পরিস্থিতি | অংশ |
|---|---|
| সন্তান থাকলে | মোট সম্পত্তির ১/৮ |
| সন্তান না থাকলে | মোট সম্পত্তির ১/৪ |
| একাধিক স্ত্রী থাকলে | সবাই মিলে ১/৮ বা ১/৪ সমানভাবে ভাগ করবেন |
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: পুত্রবধূ বা জামাই সরাসরি বাবার সম্পত্তির ওয়ারিশ নন। তারা শুধুমাত্র তাদের নিজ স্বামী বা স্ত্রীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সুবিধা পান।
যদি বাবার মৃত্যুর আগেই একটি ছেলে মারা গিয়ে থাকে, তাহলে সেই মৃত ছেলের সন্তানরা কীভাবে অংশ পাবে? হানাফি মতে সাধারণভাবে তারা বঞ্চিত হন। তবে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৪ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশে মৃত ছেলের সন্তানরা প্রতিনিধিত্ব মূলক উত্তরাধিকারের মাধ্যমে অংশ পাওয়ার অধিকারী। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার যা বাংলাদেশে প্রযোজ্য।
বাবা জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পত্তি দিতে চাইলে হেবা (Heba) বা উপহার দলিলের মাধ্যমে তা করতে পারেন। এটি উত্তরাধিকারের বিকল্প পদ্ধতি।
| বিষয় | হেবা | ওসিয়ত |
|---|---|---|
| কখন কার্যকর | জীবদ্দশায় | মৃত্যুর পর |
| সীমা | কোনো সীমা নেই | মোট সম্পত্তির ১/৩ |
| ওয়ারিশকে দেওয়া যাবে? | হ্যাঁ | না (অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া) |
| বাতিল করা যাবে? | সীমিত ক্ষেত্রে | মৃত্যুর আগে যেকোনো সময় |
যখন পারিবারিক সমঝোতায় সম্পত্তি বন্টন সম্ভব হয় না, তখন আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। বাংলাদেশে সম্পত্তি বন্টন সংক্রান্ত মামলা সাধারণত নিম্নলিখিত আদালতে দায়ের করা হয়:
বাংলাদেশে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ অনুযায়ী মামলা দায়ের করার আগে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা বাধ্যতামূলক। অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্থতায় দ্রুত ও কম খরচে সমাধান হয়।
| সেবা | আনুমানিক খরচ |
|---|---|
| আইনজীবীর পরামর্শ ফি | ৫০০ - ২,০০০ টাকা |
| মামলা দায়ের কোর্ট ফি | সম্পত্তির মূল্যের উপর নির্ভরশীল |
| উকিলের ফি (ঢাকা) | ১৫,০০০ - ১,০০,০০০+ টাকা |
| বন্টন দলিল রেজিস্ট্রেশন | সম্পত্তির মূল্যের ১-২% |
উত্তর: বাবা বেঁচে থাকলে না। বাবার মৃত্যুর পরই কেবল উত্তরাধিকারের দাবি করা যায়। তবে বাবার ঋণের জামানত হিসেবে দেওয়া পারিবারিক সম্পত্তির বিষয়ে আদালতের সাহায্য নেওয়া যায়।
উত্তর: মুসলিম আইনে কোনো ওয়ারিশকে (যেমন ছেলে) ওসিয়তের মাধ্যমে অতিরিক্ত সম্পত্তি দেওয়া যায় না যদি না অন্য ওয়ারিশরা সম্মতি দেন। ওসিয়ত শুধু তৃতীয় পক্ষকে (অ-ওয়ারিশ) করা যায় এবং তা সর্বোচ্চ ১/৩ সম্পত্তি পর্যন্ত।
উত্তর: হ্যাঁ, বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৪ ধারা অনুযায়ী মৃত পুত্রের সন্তানরা 'প্রতিনিধিত্বমূলক উত্তরাধিকার' নীতিতে দাদার সম্পত্তিতে অংশ পাবে।
উত্তর: আইনত মেয়ে তার উত্তরাধিকারের অংশ ছেড়ে দিতে পারে (যা অনেক পরিবারে প্রথাগতভাবে হয়), তবে এটি তার ইচ্ছাধীন এবং কোনো চাপ বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া সম্মতি আদালতে বাতিলযোগ্য।
উত্তর: বাংলাদেশে দেওয়ানি মামলা সাধারণত ৩-৭ বছর সময় নেয়। তবে মধ্যস্থতায় বা পারস্পরিক সমঝোতায় মাত্র কয়েক মাসেই সমাধান সম্ভব।
উত্তর: হ্যাঁ। বিদেশে থাকলেও বাংলাদেশের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারের অধিকার থাকে। পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে দেশে কাউকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করা যায়।
সম্পত্তি বন্টন সংক্রান্ত বিরোধ পারিবারিক সম্পর্কে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। আমাদের অভিজ্ঞ আইনজীবীরা আপনাকে সঠিক আইনি পরামর্শ দিয়ে এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাহায্য করতে পারেন।
আমাদের চেম্বার উত্তরা, ঢাকাতে অবস্থিত এবং আমরা প্রথম পরামর্শ বিনামূল্যে প্রদান করি। আজই যোগাযোগ করুন এবং আপনার পরিবারের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করুন।
বিনামূল্যে আইনি পরামর্শের জন্য এখানে ক্লিক করুন →
📍 চেম্বারের ঠিকানা: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম, উত্তরা, ঢাকা, বাংলাদেশ
📞 যোগাযোগ: আমাদের ওয়েবসাইটের যোগাযোগ পাতায় ফোন নম্বর পাবেন
🕐 সময়: শনি-বৃহস্পতিবার, সকাল ১০টা - বিকাল ৫টা