বাংলাদেশে পারিবারিক আইন সম্পূর্ণ গাইড ২০২৬ — বিবাহ থেকে উত্তরাধিকার

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-12

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশে পারিবারিক আইন মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য ভিন্ন। বিবাহ, তালাক, সন্তানের হেফাজত, ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকার — এই সব বিষয়ে আইনি অধিকার জানা প্রত্যেকের জন্য জরুরি।

পারিবারিক আইন কি — বাংলাদেশে প্রযোজ্য আইনসমূহ

পারিবারিক আইন হলো আইনের সেই শাখা যা বিবাহ, তালাক, সন্তান, সম্পত্তি উত্তরাধিকারসহ পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করে।

বাংলাদেশে প্রধান পারিবারিক আইনসমূহ:

  • মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ — বিবাহ, তালাক, বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রণ
  • পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ — পারিবারিক মামলার বিচার পদ্ধতি
  • মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন ১৯৭৪
  • মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ — স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার
  • অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০ — শিশুর অভিভাবকত্ব
  • পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০

যেকোনো পারিবারিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

বিবাহ আইন — বৈধ বিবাহের শর্ত

বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহের বৈধতার শর্ত:

  • বয়স: পুরুষ ১৮ বছর, মহিলা ১৮ বছর (বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭)
  • সম্মতি: উভয়পক্ষের স্বাধীন সম্মতি আবশ্যক
  • মোহর: নির্দিষ্ট পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করতে হবে
  • সাক্ষী: কমপক্ষে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষী
  • নিবন্ধন: কাজী অফিসে বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক

নিকাহনামায় স্ত্রীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা (তাফউয়িদ) অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

তালাক আইন — বিবাহ বিচ্ছেদের পদ্ধতি

বাংলাদেশে তালাকের প্রকারভেদ:

  • স্বামীর তালাক: লিখিত নোটিশ চেয়ারম্যানকে দিতে হবে, ৯০ দিন পর কার্যকর
  • স্ত্রীর তালাক (তাফউয়িদ): নিকাহনামায় ক্ষমতা থাকলে একই প্রক্রিয়ায়
  • খোলা তালাক: স্ত্রী মোহর ফেরত দিয়ে বিচ্ছেদ নিতে পারেন
  • মুবারাত: উভয়পক্ষের সম্মতিতে বিচ্ছেদ
  • বিচারিক তালাক: মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে

বিস্তারিত জানতে: তালাক নামা প্রক্রিয়া বাংলাদেশ

সন্তানের হেফাজত ও অভিভাবকত্ব

বাংলাদেশে সন্তানের হেফাজতের নিয়ম:

  • হেফাজত (Custody): শিশুর দৈনন্দিন যত্নের দায়িত্ব
    • মা: ছেলে ৭ বছর পর্যন্ত, মেয়ে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত
    • বাবা: এরপর সাধারণত বাবার কাছে যায়
  • অভিভাবকত্ব (Guardianship): সম্পত্তি ও আইনি সিদ্ধান্তের অধিকার — সাধারণত বাবা
  • সন্তানের স্বার্থ: আদালত সর্বদা শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে
  • বাবার দায়িত্ব: সন্তান যার কাছেই থাকুক, বাবাকে ভরণপোষণ দিতে হবে

ভরণপোষণ — স্ত্রী ও সন্তানের অধিকার

ভরণপোষণ (Maintenance) সংক্রান্ত আইন:

  • বিবাহকালীন: স্বামী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য
  • তালাকের পর (ইদ্দতকালে): ৩ মাস ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক
  • সন্তানের ভরণপোষণ: বাবা সন্তানের ১৮ বছর পর্যন্ত খরচ দেবেন
  • পরিমাণ নির্ধারণ: আদালত স্বামীর আয় ও সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারণ করে

ভরণপোষণ না দিলে পারিবারিক আদালতে মামলা করুন।

উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টন

মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তি বণ্টন:

  • ছেলে: মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পায়
  • মেয়ে: ছেলের অর্ধেক অংশ পায়
  • স্ত্রী: সন্তান থাকলে ১/৮, না থাকলে ১/৪ অংশ
  • মা: সন্তান থাকলে ১/৬, না থাকলে ১/৩ অংশ
  • উইল (ওসিয়ত): মোট সম্পত্তির ১/৩ পর্যন্ত উইল করা যায়

উত্তরাধিকার সনদের জন্য সাকসেশন সার্টিফিকেট প্রয়োজন।

পারিবারিক সহিংসতা ও আইনি সুরক্ষা

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ অনুযায়ী:

  • শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক নির্যাতন থেকে সুরক্ষা
  • সুরক্ষা আদেশ: আদালত দ্রুত সুরক্ষা আদেশ দিতে পারে
  • বাসস্থান আদেশ: নির্যাতনকারীকে বাড়ি থেকে বের করা যায়
  • হেল্পলাইন: ১০৯ (মহিলা ও শিশু হেল্পলাইন, ২৪ ঘণ্টা)

পারিবারিক আদালত — কীভাবে মামলা করবেন

পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ অনুযায়ী পারিবারিক মামলার বিচার করা হয়।

পারিবারিক আদালতে যা করা যায়:

  • তালাক, মোহর, ভরণপোষণের মামলা
  • শিশুর হেফাজত সংক্রান্ত মামলা
  • সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের মামলা

মামলা করার ধাপ:

  1. আবেদন ফর্ম পূরণ করুন (আইনজীবী বা আদালত অফিস থেকে পাবেন)
  2. কোর্ট ফি জমা দিন
  3. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করুন
  4. আদালতে দাখিল করুন

পারিবারিক আদালত দ্রুত বিচার করার চেষ্টা করে। ডিভোর্স আইনজীবী পুরো প্রক্রিয়ায় আপনাকে গাইড করবেন।